নির্বাচন সামনে রেখে বাড়ছে খুনের ঘটনা; লুণ্ঠিত অস্ত্র ও পেশাদার শুটারদের নিয়ে উদ্বেগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হলেও দেশে রাজনৈতিক ‘টার্গেট কিলিং’ বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। নিপুণ পরিকল্পনায় একের পর এক রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে হত্যার ঘটনা মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষ করে শরিফ ওসমান বিন হাদি এবং আজিজুর রহমান মোসাব্বিরের হত্যাকাণ্ড সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ১৩১ জন। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যমতে, এর মধ্যে ৯৩ জনই বিএনপির নেতাকর্মী। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডে অবৈধ অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ৫ আগস্টের পর লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান (২০২৫)
| রাজনৈতিক দল | নিহতের সংখ্যা |
| বিএনপি | ৯৩ জন |
| আওয়ামী লীগ | ২৩ জন |
| ইউপিডিএফ | ৬ জন |
| জামায়াতে ইসলামী | ৩ জন |
| অন্যান্য | ৬ জন |
| মোট | ১৩১ জন |
আলোচিত কিছু ‘টার্গেট কিলিং’ ঘটনা:
- শরিফ ওসমান বিন হাদি: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ককে বিজয়নগরে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে গুলি করা হয়। ৬ দিন যন্ত্রণার পর তিনি মারা যান।
- আজিজুর রহমান মোসাব্বির: স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে তেজগাঁওয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা স্ত্রীকে জানিয়ে গিয়েছিলেন।
- তারেক সাইফ মামুন: রাজধানীর আদালতপাড়ার কাছে মাত্র ৩-৪ সেকেন্ডের মধ্যে তাকে গুলি করে হত্যা করে দুই শুটার।
- অন্যান্য: যশোর, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে একইভাবে বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ: লুণ্ঠিত অস্ত্র ও কারাগার থেকে পালানো বন্দি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে লুণ্ঠিত অস্ত্র। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখনো ১৩৪০টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫৯ রাউন্ডের বেশি গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ৭০০ বন্দি, যাদের মধ্যে চরমপন্থী ও পেশাদার খুনি রয়েছে, তারা এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের প্রস্তুতি ও আদালতের হস্তক্ষেপ:
- নিরাপত্তা রিট: লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছেন আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান।
- পুলিশি প্রস্তুতি: নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্যকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
- ইসির উদ্বেগ: প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের মতে, মূল অপরাধীরা অপরাধ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ‘টার্গেট কিলিং’-এর প্রবণতা বাড়ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিতে এই পেশাদার শুটারদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
















