পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু প্রতীক আছে, যেগুলো কেবল একটি বস্তু নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। ফুটবলের বিশ্বকাপ ট্রফি ঠিক তেমনই এক প্রতীক। সোনালি এই ট্রফি হাতে তোলার স্বপ্ন দেখেননি—এমন কোনো ফুটবলার খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই ট্রফিকে ঘিরে জড়িয়ে আছে অসংখ্য আনন্দ, বেদনা, আবেগ আর নাটকীয় ঘটনার গল্প। ফিফা বিশ্বকাপের এই ট্রফির ছোঁয়া পেয়েছেন পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, বেকেনবাওয়ার, ববি মুর, জিদানের মতো অসংখ্য কিংবদন্তি।
বিশ্বকাপ ট্রফি শুধু একটি শিরোপা নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন সব ঘটনা, যা রোমাঞ্চকর সিনেমাকেও হার মানাতে পারে। কখনো এই ট্রফি লুকানো ছিল জুতার বাক্সে, কখনো আবার চুরির ঘটনায় পুরো বিশ্ব চমকে উঠেছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত দুটি আলাদা ট্রফি ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমটি ছিল জুলে রিমে ট্রফি, যা ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা ট্রফিটি স্থায়ীভাবে রেখে দেবে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার শিরোপা জিতে সেই ট্রফির মালিক হয়। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমান নকশার ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি।
জুলে রিমে ট্রফির নামকরণ করা হয়েছিল ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলে রিমের সম্মানে। তিনি ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত টানা ৩৩ বছর ফিফার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যা এখনো রেকর্ড। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। ট্রফিটির নকশা করেছিলেন ফরাসি ভাস্কর অ্যাবেল লাফ্ল্যুর। গ্রিক বিজয়দেবী নাইকির আদলে তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ৩.৮ কেজি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ট্রফির নিরাপত্তা নিয়ে বড় সংকট তৈরি হয়। তখন ১৯৩৮ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে ছিল ট্রফিটি। নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে বাঁচাতে ফিফার সহসভাপতি অত্তোরিনো বারাসি ট্রফিটি একটি ব্যাংকের ভল্ট থেকে সরিয়ে নিজের শোবার ঘরে নিয়ে আসেন। পুরো যুদ্ধকালজুড়ে সেটি তাঁর বিছানার নিচে একটি জুতার বাক্সে লুকানো ছিল।
১৯৫৮ বিশ্বকাপে আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত যোগ হয়। ফটোসাংবাদিকদের অনুরোধে ব্রাজিল দলের অধিনায়ক হিলদারালদো বেলিনি প্রথমবারের মতো ট্রফি মাথার ওপর তুলে ধরেন। এরপর থেকেই বিশ্বকাপ জয়ের উদ্যাপনে এই ভঙ্গি চিরাচরিত হয়ে ওঠে।
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ শুরুর আগে লন্ডনের এক প্রদর্শনী থেকে জুলে রিমে ট্রফি চুরি হয়ে যায়। তদন্তে নামে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছিল না। এক সপ্তাহ পর ডেভিড করবেট নামের এক ব্যক্তি তাঁর কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে একটি গাড়ির নিচে মোড়ানো প্যাকেট দেখতে পান। সেটি খুলে দেখা যায়, হারিয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি। এই ঘটনায় পিকলস রাতারাতি জাতীয় নায়ক হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তার কারণে এরপর ইংল্যান্ডে জুলে রিমে ট্রফির একটি প্রতিরূপ তৈরি করা হয়। পরে সেটি নিলামে বিক্রি হলেও ফিফা নিশ্চিত করে, সেটি আসল ট্রফি নয়। বর্তমানে সেই প্রতিরূপ ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত।
কিন্তু নাটক এখানেই শেষ নয়। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে পাওয়ার পর ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের দপ্তর থেকে আসল জুলে রিমে ট্রফি আবার চুরি হয়ে যায়। কয়েকজন দোষী সাব্যস্ত হলেও ট্রফিটি আর কখনো উদ্ধার হয়নি। ধারণা করা হয়, সেটি গলিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যদিও এর নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
এরপর থেকেই চালু থাকা নতুন ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির নকশা করেন ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগা। ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ৩৬.৫ সেন্টিমিটার। তবে এটি সম্পূর্ণ খাঁটি সোনা নয়, ভেতরে ফাঁপা কাঠামো রয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বকাপজয়ী দল উদ্যাপনের পরপরই আসল ট্রফি ফিফার কাছে ফিরিয়ে দিতে হয়। চ্যাম্পিয়ন দল পায় ব্রোঞ্জের তৈরি, সোনালি প্রলেপ দেওয়া একটি প্রতিরূপ। শুধু বিশ্বজয়ী ফুটবলার, ফিফা সভাপতি ও রাষ্ট্রপ্রধানরাই আসল ট্রফি স্পর্শ করার অনুমতি পান।
বিশ্বকাপ ট্রফি উপহার হিসেবে পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ২০১০ বিশ্বকাপের আগে ফিফা তাঁকে একটি প্রতিরূপ উপহার দেয়।
এভাবেই বিশ্বকাপ ট্রফি শুধু ফুটবলের শ্রেষ্ঠ অর্জনের প্রতীক নয়, বরং ইতিহাস, রাজনীতি, যুদ্ধ আর রহস্যে ঘেরা এক অনন্য স্মারক।
















