ইসরায়েলি দখল ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দখলের আশঙ্কার মধ্যে ফিলিস্তিন তাদের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অস্থায়ী তালিকায় নতুন করে ১৪টি স্থাপনার নাম জমা দিয়েছে।
ফিলিস্তিনি পর্যটন ও পুরাকীর্তি মন্ত্রণালয় জানায়, ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই আবেদন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকার ঝুঁকিতে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার আওতায় আনা। গাজায় চলমান যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি হামলায় দুই শতাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
ফিলিস্তিনি পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব ঐতিহ্য শাখার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মারওয়া আদওয়ান বলেন, ফিলিস্তিন কেবল রাজনৈতিক সংঘাতের ভূখণ্ড নয়, এটি হাজার বছরের মানবসভ্যতার ধারক। ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে একচেটিয়া করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তার বিরুদ্ধে এই বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় জবাব।
নতুন করে জমা দেওয়া ১৪টি স্থাপনা যুক্ত হওয়ায় ইউনেস্কোর অস্থায়ী তালিকায় ফিলিস্তিনি স্থাপনার সংখ্যা দাঁড়াল ২৪টিতে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব তিন হাজার বছরের প্রাচীন কানানীয় নগররাষ্ট্র থেকে শুরু করে গাজার পুরোনো শহর পর্যন্ত বিস্তৃত নানা নিদর্শন।
তালিকায় অন্তর্ভুক্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজার ঐতিহাসিক কেন্দ্র, গ্রেট ওমারি মসজিদ ও সেন্ট পোরফিরিয়াস গির্জা, জাবালিয়ার বাইজান্টাইন চার্চ, নাবলুসের ঐতিহাসিক শহর ও আশপাশের এলাকা, যিশুর অলৌকিক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পথসমূহ, জেরুজালেম মরুভূমির মঠসমূহ, বিভিন্ন মাকাম বা ধর্মীয় উপাসনাস্থল, প্রাচীন জলব্যবস্থা কানাত এস-সাবিল, জাবাল আল-ফুরেইদিস বা হেরোডিয়াম, নিম্ন জর্ডান নদী উপত্যকা, তুলুল আবু আল-আলাইকের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাসাদ, ওয়াদি খারিতুনের প্রাগৈতিহাসিক গুহা, ফিলিস্তিনের বসবাসযোগ্য গুহা এবং আধুনিক স্থাপত্য নিদর্শন।
গাজার ঐতিহ্য রক্ষাকে এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন মারওয়া আদওয়ান। তিনি বলেন, প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছরের পুরোনো গ্রেট ওমারি মসজিদ এবং ৪২৫ সালে নির্মিত সেন্ট পোরফিরিয়াস গির্জা যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করা ভবিষ্যতে পুনর্গঠন ও আইনি সুরক্ষার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ফিলিস্তিনি এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে ইসরায়েল। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের এরিয়া সি অঞ্চলে অবস্থিত কিছু স্থাপনা নিয়ে ইসরায়েল আপত্তি তুলেছে। দেশটির একাধিক মন্ত্রী এ উদ্যোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইউনেস্কোতে এটি ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, ঐতিহ্য কখনো অস্ত্র হতে পারে না। তাদের মতে, সংস্কৃতি ও ইতিহাস মানবতার সেতুবন্ধন, আর এটিকে নিরাপত্তা বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত করা ইতিহাস বিকৃত করার শামিল।
এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এলো, যখন ইসরায়েল জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত বা ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও ইউনেস্কো থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এর পরও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বলছেন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করা তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং দখল ও ধ্বংসের আগেই এসব স্থাপনাকে সুরক্ষার আওতায় আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।















