৪৫৭ পৃষ্ঠার রায়ে উঠে এসেছে নৃশংসতার ভয়াবহ চিত্র; সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়ার নির্দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ৪৫৭ পৃষ্ঠার এই রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, শেখ হাসিনা চাইলে আলোচনার মাধ্যমে সহজেই আন্দোলনের অবসান ঘটাতে পারতেন, কিন্তু তিনি সচেতনভাবে দমনপীড়ন ও নৃশংসতার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে এই রায় প্রকাশ করা হয়। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ নভেম্বর এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছিলেন। রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পাশাপাশি তাঁদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণের নজিরবিহীন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগসমূহ:
- শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুযোগ উপেক্ষা: ট্রাইব্যুনাল বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পন্থায় মীমাংসার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের অবজ্ঞা করে তাদের ইতিহাসের নৃশংসতম সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
- সুপরিকল্পিত উস্কানি: রায়ে উল্লেখ করা হয়, ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলা ছিল একটি সুপরিকল্পিত উস্কানি। এছাড়া তৎকালীন ঢাবি উপাচার্যের সঙ্গে ফোনালাপে আন্দোলনকারীদের ‘ফাঁসি দেওয়ার’ সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
- মারণাস্ত্র ও হেলিকপ্টারের ব্যবহার: ১৮ জুলাই শেখ ফজলে নূর তাপস ও হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে ফোনালাপে ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান নির্ণয় এবং হেলিকপ্টার থেকে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার সরাসরি নির্দেশ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। এর ধারাবাহিকতায় সাভারের আশুলিয়ায় লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়।
- সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ: দণ্ডিতদের নামে থাকা জমি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স ও শেয়ারসহ সব সম্পদ রাষ্ট্রকে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসা ও কল্যাণে ব্যয় করতে বলা হয়েছে।
আদালত এই রায়কে ‘ন্যায়বিচারের মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ক্ষমতার শীর্ষে থেকে নিরীহ জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও নৃশংসতা কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়। এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া একটি ঐতিহাসিক আইনি দলিলে রূপান্তরিত হলো।
















