৯ জানুয়ারি ২০২৬: ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন এ অভিযানের পক্ষে তেল ও মাদকবিরোধী যুক্তি তুলে ধরলেও বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে মূল চালিকা শক্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিশেষ করে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
শনিবার পরিচালিত ওই অভিযানে মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয় এবং সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগে মামলা করা হয়। মাদুরো আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে একাধিক দেশ, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে অবৈধ অপহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার দাবি করছে, ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ও মাদক পাচার এই অভিযানের মূল কারণ। কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই যুক্তি ততটা শক্ত নয়। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানি এখন মোট আমদানির খুব সামান্য অংশ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সরবরাহকারী কানাডা, আর দেশটির নিজস্ব উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাছাড়া ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় ভেঙে পড়েছে এবং দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর মতো অবস্থায় নেই। অভিযানের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন না হওয়াও ইঙ্গিত দেয়, তেল ছিল না প্রধান চালক।
মাদক পাচারের যুক্তিও প্রশ্নের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোকেন পাচারের অভিযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে, ভেনেজুয়েলা মূলত একটি ট্রানজিট রুট, বড় উৎপাদক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা অধিকাংশ মাদক আসে মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা হয়ে। ফলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, মাদকবিরোধী যুক্তি ছিল মূলত একটি অজুহাত।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত কারণ খুঁজতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় নজর দিতে হবে। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩১টি ইলেক্টোরাল ভোটের এই রাজ্যে অল্প কিছু ভোটের হেরফেরেই জাতীয় নির্বাচনের ফল বদলে যেতে পারে।
ফ্লোরিডায় কিউবান ও ভেনেজুয়েলান বংশোদ্ভূত ভোটারদের বড় একটি অংশ রয়েছে, যারা বামপন্থী ও সমাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান সমর্থন করে। এই ভোটব্যাংককে সন্তুষ্ট রাখতে ভেনেজুয়েলার মতো দেশের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণে মার্কিন রাজনীতিকদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফ্লোরিডার রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রুবিও দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলোর বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়ে আসছেন। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ফ্লোরিডার রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাবশালী দাতা গোষ্ঠী ও আদর্শিক জোটগুলোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। এসব গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে।
এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রভাবও গভীর। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ অগ্রাধিকার পেলে আন্তর্জাতিক আইন সহজেই উপেক্ষিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও সতর্কবার্তা, যেখানে কেবল জ্বালানি বা কৌশলগত গুরুত্বের ওপর নির্ভরশীল জোট যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার ঘটনা প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি অনেক সময় তেল বা নিরাপত্তার চেয়েও বেশি প্রভাবিত হয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আদর্শিক হিসাব-নিকাশে।
















