সংসদ নির্বাচনের দিনই ভাগ্য নির্ধারিত হবে ‘জুলাই সনদ’-এর; জনমত গঠনে মাঠ চষে বেড়াবেন আসিফ মাহমুদের প্রতিনিধিরা
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের গতিপথ। একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঐতিহাসিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় নিশ্চিত করতে এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ফসল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এক বিশাল ও সমন্বিত প্রচার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটি দেশজুড়ে ২৭০ জন ‘অ্যাম্বাসেডর’ বা বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যারা সরাসরি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে কেবল গণভোটের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করবেন। সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে গণভোটের গুরুত্ব যাতে ঢাকা পড়ে না যায়, সে লক্ষ্যেই এই বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়েছে।

যেসব আসনে এনসিপির নিজস্ব সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী নেই, সেই ২৭০টি আসনেই এই ‘অ্যাম্বাসেডর’দের নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের মূল দায়িত্ব হবে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গিয়ে সাধারণ ভোটারদের কাছে ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত সহজভাবে ব্যাখ্যা করা। তারা জনগণকে বোঝাবেন কেন এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় দেওয়া জরুরি এবং কীভাবে এই রায় আগামী দিনের বাংলাদেশকে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
এই দেশব্যাপী প্রচার অভিযানের সার্বিক নেতৃত্বে থাকবেন দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা, মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সামাল দিতে এনসিপি তাদের ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ পুনর্গঠন করেছে। ৩১ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটিতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে চেয়ারম্যান এবং মনিরা শারমিনকে সেক্রেটারি করা হয়েছে। কমিটিতে ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি এবং লে. কর্নেল (অব.) মো. সাব্বির রহমানের মতো দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এই কমিটিই মূলত মাঠপর্যায়ে ২৭০ জন অ্যাম্বাসেডরের কার্যক্রম মনিটরিং করবে এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে কাজ করবে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক হিসেবে এনসিপি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৩০টি আসনে সমঝোতার আলোচনা চললেও এনসিপির প্রার্থীরা ৪৪টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।
তবে দলটির নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, জোটের স্বার্থে প্রয়োজনে তারা প্রার্থী সরিয়ে নেবেন, কিন্তু গণভোটের প্রচারণায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়া যেমন নাগরিক অধিকার, গণভোটে রায় দেওয়া তেমনি জাতীয় দায়িত্ব। আমরা চাই জনগণ যেন বুঝে-শুনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, যাতে ফ্যাসিবাদ ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটাররা দুটি আলাদা ব্যালটে ভোট দেবেন। সংসদ নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ব্যালটের পাশাপাশি গণভোটের জন্য থাকবে একটি বিশেষ রঙের ব্যালট পেপার। এই গণভোটে মূলত ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর পক্ষে বা বিপক্ষে জনগণের প্রত্যক্ষ রায় চাওয়া হবে।

যদি ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়, তবে সংবিধানে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের মতো বৈপ্লবিক সংস্কারগুলো আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা পাবে। এনসিপির এই ‘অ্যাম্বাসেডর’ কর্মসূচি মূলত এই সংস্কারগুলোর পক্ষেই এক বিশাল জনমত তৈরির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই পরিকল্পনা নির্বাচনি মাঠে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ থাকায়, ২৭০ জন অ্যাম্বাসেডরের তৎপরতা গণভোটের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম কোনো জাতীয় নীতিনির্ধারণী পরীক্ষা, যেখানে সরাসরি জনগণের রায় প্রতিফলিত হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা করছে এনসিপি।
















