প্রায় তিন দশক ধরে ভেনেজুয়েলার জাতীয় বলিভারিয়ান সশস্ত্র বাহিনী বা ন্যাশনাল বলিভারিয়ান আর্মড ফোর্সেস দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছে। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজ এবং পরবর্তী সময়ে নিকোলাস মাদুরো—উভয় সরকারের আমলেই সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
চাভেজ ও মাদুরো সরকারের বিনিময়ে সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয় মন্ত্রণালয়, প্রাদেশিক গভর্নরশিপ, কূটনৈতিক পদ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্ব। এর বদলে সেনাবাহিনী সরকারকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, প্রতিষ্ঠান ভাঙন এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
তবে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে মাদুরোকে রাজধানী কারাকাসের সামরিক ঘাঁটি ফুয়ের্তে তিউনা থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সেনাবাহিনীর সেই ‘রাষ্ট্ররক্ষক’ ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। ঘটনাটি ভেনেজুয়েলার সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও প্রকাশ করে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সামনে এখন কঠিন সিদ্ধান্ত। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও কারাকাসে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ডেলসি রদ্রিগেজ–এর সঙ্গে সমঝোতায় অংশ নেওয়া। অন্যদিকে রয়েছে সেই পথে না গিয়ে আরও মার্কিন হামলার ঝুঁকি এবং নিজেদের ক্ষমতা ও মর্যাদা হারানোর আশঙ্কা।
২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর মাদুরো সরকারের বৈধতা সংকট তীব্র হয়। তখন থেকেই দেশটিতে কার্যত এক ধরনের পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হয়, যেখানে বিরোধীদের ওপর নজরদারি ও দমনমূলক কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর ভূমিকা আরও বেড়ে যায়। শাসক দল পিএসইউভি, আধাসামরিক গোষ্ঠী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে একীভূত করে সরকার যে ‘নাগরিক–সামরিক–পুলিশ ঐক্য’ গড়ে তোলে, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল সেনাবাহিনী।
মাদুরো অপসারণের পরও এই বাস্তবতা বদলায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন—গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হোক বা বলপ্রয়োগে—সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া দেশ শাসন কার্যত অসম্ভব।
এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী নেতৃত্বে সমর্থন দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাই ওয়াশিংটনের আস্থার বড় কারণ। তবে মাদুরোর অপহরণ একসঙ্গে সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতাও দেখিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির তুলনায় তাদের দুর্বল অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
এই ঝুঁকিই সেনাবাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় প্রণোদনা—সমঝোতার পথে যাওয়ার। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইলে সেনা নেতৃত্বকে কয়েকটি বড় ছাড় দিতে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মাদক পাচারের অভিযোগ থেকে নিজেদের দূরে রাখা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন তেল চুক্তি মেনে নেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ দমনমূলক ভূমিকায় কিছুটা লাগাম টানা।
একই সঙ্গে সেনাবাহিনীকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজের পাশে দাঁড়াতে হবে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কার্যকর পথ এখন তিনিই। দেশীয়ভাবে এই অবস্থানকে তারা স্থিতিশীলতা রক্ষার যুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পথ বেছে নিলে সেনাবাহিনী মাদুরো–পরবর্তী ভেনেজুয়েলায় এক ধরনের স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক অভিযানের ঝুঁকি রয়েছে, যা সেনাবাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
















