৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীই বিরোধী দলের; নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা ও তারিক সিদ্দিকের নাম
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সুপরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ। ‘জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গুমের প্রকৃত সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার হতে পারে। রোববার (০৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় তিনি একে ‘পৈশাচিকতার ডকুমেন্টেশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রতিবেদনে গুমের প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী জানান, দাখিলকৃত ১,৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে ১,৫৬৯টি ঘটনা গুম হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অন্ধকার অধ্যায়ের দালিলিক প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
পৈশাচিকতার পরিসংখ্যান: বিরোধী দলই প্রধান টার্গেট
তদন্ত কমিশনের তথ্যানুযায়ী, গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এক ভয়াবহ বৈষম্য:
- রাজনৈতিক পরিচয়: গুম হওয়া ব্যক্তিদের ৯৬.৭ শতাংশই বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
- মৃত্যু ও নিখোঁজ: ২৮৭ জন ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছেন, যার মধ্যে ৩৬ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
- লিঙ্গ বৈচিত্র্য: ভুক্তভোগীদের ৯৮.৫ শতাংশই পুরুষ। তবে সামাজিক ভীতি ও লোকলজ্জার কারণে নারীদের তথ্য কম এসেছে বলে কমিশন ধারণা করছে।
নির্দেশদাতা ও প্রধান ঘাতক যারা
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সবুজ সংকেত ছাড়া এমন প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ সম্ভব ছিল না। অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছেন: ১. সরাসরি নির্দেশদাতা: শেখ হাসিনা (সাবেক প্রধানমন্ত্রী), তারিক আহমেদ সিদ্দিক (প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা) ও আসাদুজ্জামান খান কামাল (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী)। ২. সহযোগী কর্মকর্তা: জিয়াউল আহসান (সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক), মনিরুল ইসলাম এবং হারুন অর রশীদ (ডিবি প্রধান)।
লাশ গুমের ‘ডেথ জোন’: বলেশ্বর ও বুড়িগঙ্গা
তদন্তে উঠে এসেছে যে, গুমের পর লাশ নিশ্চিহ্ন করতে নির্দিষ্ট কিছু এলাকা ব্যবহৃত হতো। বরিশালের বলেশ্বর নদী ছিল লাশ গুমের প্রধান কেন্দ্র। এছাড়া বুড়িগঙ্গা ও মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টেও মরদেহ ফেলে দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে কমিশন।
দায়ী বাহিনী ও ‘রেন্ডিশন’ বিতর্ক
গুমের ২৫ শতাংশ ঘটনার জন্য র্যাব (RAB) এবং ২৩ শতাংশের জন্য পুলিশ দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর নামও এসেছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, গুমের শিকার অনেককে গোপনে প্রতিবেশী দেশ ভারতে হস্তান্তরের (রেন্ডিশন) তথ্যও পেয়েছে কমিশন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়া
প্রতিবেদন গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “গণতন্ত্রের লেবাস পরে মানুষের ওপর এই পৈশাচিক আচরণ করা হয়েছে। মানুষ কত নিচে নামতে পারে, এটি তার প্রামাণ্য দলিল।” তিনি এই প্রতিবেদন সহজ ভাষায় জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
















