রায়েরবাজারে ১১৪টি মরদেহ উত্তোলনের পর ফরেনসিক সাফল্য; মিনেসোটা প্রটোকল মেনে শনাক্তকরণ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর ডিএনএ প্রোফাইলিং ও উন্নত ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা অজ্ঞাতনামা আট শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শহীদদের নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা হয় এবং তাঁদের পরিবারকে কবর বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে পরিচালিত এই উদ্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্তের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
অজ্ঞাত পরিচয় হিসেবে দাফন করা স্বজনদের কবরের সন্ধান পেয়ে রায়েরবাজার কবরস্থানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১৮ মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অনিশ্চয়তা শেষে কবরের পাশে কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
শনাক্তকৃত ৮ শহীদের পরিচয়
সিআইডি’র তথ্য অনুযায়ী, শনাক্তকৃত শহীদরা হলেন: ১. মো. মাহিন মিয়া (২৫): ময়মনসিংহ; ১৮ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ২. আসাদুল্লাহ: শেরপুর; ১৯ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ৩. পারভেজ বেপারী: চাঁদপুর; ১৯ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ৪. রফিকুল ইসলাম (পিরোজপুর): ১৯ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ৫. সোহেল রানা: মুন্সীগঞ্জ; ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শহীদ হন। ৬. রফিকুল ইসলাম (ফেনী): ১৯ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ৭. ফয়সাল সরকার: কুমিল্লা; ২২ জুলাই ২০২৪-এ শহীদ হন। ৮. কাবিল হোসেন (৫৮): ঢাকা; ২ আগস্ট ২০২৪-এ শহীদ হন।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ‘মিনেসোটা প্রটোকল’
সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ জানান, আদালতের নির্দেশে ১১৪টি অজ্ঞাত মরদেহ উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
- বিশেষজ্ঞ সহায়তা: জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ড. লুইস ফন্ডেব্রিডার এবং ড. মরিস টিডবল-বিঞ্জ এই প্রক্রিয়ার কারিগরি দিক ও প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব দেন।
- স্বচ্ছতা: পুরো অভিযানটি ‘মিনেসোটা প্রটোকল’ (বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তদন্তের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা) মেনে সম্পন্ন করা হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে।
- অস্থায়ী মর্গ: গত ৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রায়েরবাজার কবরস্থানে একটি অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে ফরেনসিক কার্যক্রম চালানো হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীর প্রতীক এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, এই উদ্যোগ কেবল পরিচয় শনাক্তকরণ নয়, বরং ভবিষ্যতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণের একটি বড় পদক্ষেপ। স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, প্রতিটি শহীদের মর্যাদা রক্ষা সরকারের অগ্রাধিকার।
সিআইডি জানিয়েছে, ১১৪টি মরদেহের মধ্যে ৯টি পরিবারের ডিএনএ নমুনার ভিত্তিতে ৮ জনের পরিচয় মিলেছে। বাকি একটির কাজ চলছে এবং পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট শহীদদেরও পরিচয় শনাক্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।















