১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ হিসেবে দেখছেন ড. দিলারা চৌধুরী; নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব নিয়ে জেনারেল আমিনুলের প্রশ্ন
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে চরম শঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এই নির্বাচন যদি সর্বজনগ্রাহ্য ও অংশগ্রহণমূলক না হয়, তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট তো কাটবেই না, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও প্রকট হবে। রোববার (০৪ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশিষ্টজনরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, একটি ‘ম্যানেজড নির্বাচন’ বা নিয়ন্ত্রিত ভোটের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সংহতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ‘ভয়েস ফর রিফর্মস’ এবং ‘ব্রেইন’ (BRAIN) এর উদ্যোগে ‘আঞ্চলিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণের প্রেক্ষিতে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব বিস্ফোরক মন্তব্য উঠে আসে।
‘ম্যানেজড নির্বাচন’ ও জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে বহুমুখী নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি ন্যূনতম ঐক্য গড়ে না ওঠে, তবে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা অসম্ভব।” তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে:
- জুলাই সনদের অবমূল্যায়ন: এক দিনে গণভোট এবং সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ফলে ‘জুলাই সনদ’ বা গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা গুরুত্ব হারাবে।
- আঞ্চলিক ঝুঁকি: দেশের ভেতরে রাজনৈতিক সংহতি না থাকলে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসা নিরাপত্তা হুমকিগুলো সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।
- সংকটের স্থায়িত্ব: বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি ‘ম্যানেজড’ বা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের দিকে দেশ যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন, যা কোনোভাবেই সংকট নিরসন করবে না।
নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের ‘খাপছাড়া’ সম্পর্ক
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমিনুল করিম বর্তমান পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করে বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্পর্ক বর্তমানে অনেকটা খাপছাড়া। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী সংসদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা কেবল অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব।” তিনি মনে করেন, এই সরকার জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুসংহত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
গণতন্ত্রই একমাত্র পথ
আলোচনা সভায় বক্তারা একমত হন যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হলো কার্যকর গণতন্ত্র। এর জন্য প্রয়োজন:
১. রাজনৈতিক সংহতি: দলগুলোর মধ্যে বিভেদ দূর করে জাতীয় ইস্যুতে একমত হওয়া।
২. অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন: কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে আয়োজিত নির্বাচন দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
৩. সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: সেনাসদস্য বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের সামরিক প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন অনেকে।
পটভূমি
উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। একই দিনে সংবিধান সংস্কারের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত এবং মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিশ্লেষকদের এই উদ্বেগ জনমনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।















