ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হামলা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আইন বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, এই হামলা সরাসরি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং এটি কার্যত একটি যুদ্ধের সমতুল্য।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন ভেনেজুয়েলায় হামলার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথিত ‘মাদক-সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ পরিচালনার অভিযোগে। শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, কারাকাসে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পর মাদুরোকে আটক করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে। তিনি দাবি করেন, এতে ভেনেজুয়েলার জনগণ নিরাপদ, স্বাধীন ও সমৃদ্ধ হবে।
তবে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ক্লেয়ার ফিঙ্কেলস্টাইন আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, এটি একটি অবৈধ বলপ্রয়োগ এবং ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে মাদুরোর ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক অধিকারও এতে লঙ্ঘিত হয়েছে।
ফিঙ্কেলস্টাইন বলেন, জাতিসংঘ সনদসহ আন্তর্জাতিক আইনের বহু বিধানে কোনো উসকানি ছাড়া এক রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্রের হামলা নিষিদ্ধ। জাতিসংঘ সনদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না।
এই হামলার আগে কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো প্রমাণ ছাড়াই মাদুরোকে মাদক পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ করে আসছিল। এর অংশ হিসেবে ক্যারিবীয় অঞ্চলে কথিত মাদকবাহী নৌকায় হামলা, ভেনেজুয়েলার উপকূলে তেলবাহী জাহাজ জব্দ, মাদুরোর পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দেশটির ভেতরে হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টম কটন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, মাদুরো শুধু একজন অবৈধ শাসকই নন, তিনি একটি বড় মাদক পাচার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন। তবে এসব অভিযোগ ভেনেজুয়েলা সরকার বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। মাদুরো আগেই জানিয়েছিলেন, মাদক পাচার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তিনি প্রস্তুত, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আসলে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের দখল নিতে চাইছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারাও ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই যুদ্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসের হাতে। তবে গত কয়েক দশকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এর নামে বিভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান চালিয়ে এই ক্ষমতা কার্যত পাশ কাটানো হয়েছে।
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট গ্রেগরি মিকস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না, যা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সামরিক পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিতে পারে।
অধ্যাপক ফিঙ্কেলস্টাইনও একই মত পোষণ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কোনো আসন্ন বা জরুরি হুমকি না থাকায় প্রেসিডেন্টের এককভাবে হামলা চালানোর কোনো আইনগত সুযোগ ছিল না। তাঁর মতে, এমনকি মাদক পাচারকে বড় হুমকি ধরলেও তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার অজুহাতে কংগ্রেসকে পাশ কাটানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ ট্রাম্পের পরিকল্পনাও সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো রাষ্ট্র অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে ঢুকে তার সরকার পরিচালনা করতে পারে না। এমনকি মাদুরো নিজে থেকেই ক্ষমতা হারালেও যুক্তরাষ্ট্রের সেখানে শাসন কায়েম করার অধিকার নেই।
ফিঙ্কেলস্টাইনের মতে, গণতন্ত্রের মূল ধারণা হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং নিজেদের নেতা নিজেরাই বেছে নেওয়ার অধিকার। লাতিন আমেরিকায় সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরদার করার বদলে যুক্তরাষ্ট্র যদি তা undermining করে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী হবে।
















