ইরানে চলমান বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া মন্তব্যকে অবৈধ ও উসকানিমূলক আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে তেহরান। ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আমির সাইয়েদ ইরাভানি জাতিসংঘ মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব হুমকির নিন্দা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
শুক্রবার পাঠানো ওই চিঠি আসে এমন এক সময়, যখন ট্রাম্প বলেছিলেন যে ইরানে চলমান জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধিবিরোধী বিক্ষোভ দমনে আরও প্রাণহানি হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, পরিস্থিতি সহিংস হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত অবস্থায় আছে।
চিঠিতে ইরাভানি বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য বেপরোয়া ও উসকানিমূলক এবং এটি জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের এসব মন্তব্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে উসকে দেওয়া বা সেটিকে বাহ্যিক চাপ কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার চরম লঙ্ঘন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইরান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করছে এবং প্রয়োজন হলে তা দৃঢ় ও আনুপাতিকভাবে প্রয়োগ করবে।
চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, এসব অবৈধ হুমকি ও তার ফলে সৃষ্ট উত্তেজনা বৃদ্ধির দায় সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা পুরো চিঠিটি প্রকাশ করেছে।
এরই মধ্যে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার কুম, মারভদাশত, ইয়াসুজ, মাশহাদ, হামাদানসহ তেহরানের তেহরানপার্স ও খাক সেফিদ এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। রাজধানী তেহরানে দোকানিদের ধর্মঘটের পর থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত অন্তত নয়জন নিহত এবং ৪৪ জনকে আটক করা হয়েছে। কুম প্রদেশের উপগভর্নর জানিয়েছেন, এক ব্যক্তি নিজের হাতে গ্রেনেড বিস্ফোরণে মারা গেছেন, যা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার চেষ্টা ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে। এর জবাবে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপ পুরো অঞ্চলজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং মার্কিন স্বার্থ ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়াবে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে ভুগছে। মুদ্রার দরপতন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রভাব রাজধানী তেহরানসহ সারা দেশে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক নরম সুরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারও দায়ী এবং সমাধানের পথ খোঁজা হবে। পর্যবেক্ষকদের মতে, আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় সরকারের এই অবস্থান ব্যতিক্রমী।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা ১২ দিনের উত্তেজনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। ট্রাম্প সেই অভিযানকে অত্যন্ত সফল বলে উল্লেখ করেছিলেন। সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আবারও সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি পারমাণবিক বা ব্যালিস্টিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর জবাব দেবে।
এর বিপরীতে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
















