ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে চলমান রক্তক্ষয়ী অভ্যন্তরীণ সংঘাত সমাধানে সহায়তার জন্য দেশটির সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের অনুরোধকে স্বাগত জানিয়েছে সৌদি আরব। শনিবার এক বিবৃতিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই সংকট নিরসনে রিয়াদে একটি আলোচনামূলক ফোরাম আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে দক্ষিণ ইয়েমেনের সব রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রিয়াদে আয়োজিত ফোরামে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। সেখানে দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যার ন্যায্য ও সমন্বিত সমাধানের লক্ষ্যে একটি সার্বিক রূপরেখা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এর আগে শনিবার ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল আলিমি দক্ষিণ ইয়েমেনের বিভিন্ন গোষ্ঠী ও নেতাদের রিয়াদে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে। তিনি দক্ষিণাঞ্চলের দাবিকে ন্যায্য ও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে একতরফা কিংবা কাউকে বাদ দিয়ে সমাধানের পথ প্রত্যাখ্যান করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ ইয়েমেনে সহিংসতা নতুন করে ছড়িয়ে পড়ে, যখন বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল হাদরামাউত ও আল মাহরা প্রদেশে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে। এই দুই প্রদেশ ইয়েমেনের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড জুড়ে বিস্তৃত।
তেলসমৃদ্ধ হাদরামাউত প্রদেশটি সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কারণে অঞ্চলটি সৌদিদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গত মাসে এসটিসি ওই এলাকা দখল করায় সৌদি আরব এটিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।
যদিও এসটিসি ইয়েমেনের দক্ষিণে হুথিবিরোধী জোটের অংশ, তবু তারা একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য পোষণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এবং প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়েছে।
সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, তাদের জোটসঙ্গী সংযুক্ত আরব আমিরাত এসটিসিকে অস্ত্র সহায়তা দিচ্ছে, যার ফলে ইয়েমেন তিন ভাগে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এটি সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আমিরাত বলেছে, তারা সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
শনিবার এক বিবৃতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত চলমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইয়েমেনের সব পক্ষকে সংযম ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানায়, যাতে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
২০১৫ সালে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের উত্তর ইয়েমেন থেকে উৎখাতের লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে যে জোট গঠিত হয়, সেই সংঘাত এক দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি। হুথিরা উত্তরাঞ্চলে অবস্থান ধরে রেখেছে, আর দক্ষিণে সৌদি ও আমিরাত সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে।
শুক্রবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছে বলে এসটিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের সব সামরিক সদস্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়, যা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটগুলোর অবশিষ্ট দায়িত্ব শেষ করার সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই এই প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং এটি সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।
এ অবস্থায় এসটিসি একতরফাভাবে ঘোষণা দিয়েছে, তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে উত্তর ইয়েমেন থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করতে চায়। তবে সাবেক ইয়েমেনি কূটনীতিক ও সংসদ সদস্য আলী আহমেদ আল আমরানি আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, বিচ্ছিন্নতাই ইয়েমেন সংকটের সমাধান নয় এবং এটি জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন ঘটায় না।
ইয়েমেন বিষয়ে ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশ্লেষক হিশাম আল ওমেইসি সতর্ক করে বলেন, এই সহিংসতা দ্রুত থামানো না গেলে যুদ্ধের একটি নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায় শুরু হতে পারে। তাঁর মতে, দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা থেকে সামনে আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
















