ঢাকা বাংলাদেশের একটি গ্রাম থেকে রাজধানীতে চিকিৎসাধীন এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। গুরুতর আহত খোকন চন্দ্র দাসের স্ত্রী সীমা দাস জানিয়েছেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে কারও কোনো শত্রুতা বা বিরোধ ছিল না। তবুও কেন এভাবে তাঁর স্বামীর ওপর নৃশংস হামলা চালানো হলো, তা তারা বুঝতে পারছেন না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্বামীর পাশে বসে সীমা দাস জানান, আমরা কারও সঙ্গে কোনো বিষয়েই বিরোধে জড়াইনি। হঠাৎ করে কেন আমার স্বামীকে লক্ষ্য করে এমন ভয়াবহ হামলা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা আমাদের কাছে নেই। কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
খোকন চন্দ্র দাস বর্তমানে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় তিনি দুই হামলাকারীকে চিনে ফেলেছিলেন। এরপরই হামলাকারীরা তাঁর মাথা ও মুখে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর স্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা গেছে, খোকন দাস গ্রামের একটি ওষুধের দোকান ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করতেন। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরের ওই গ্রামে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে বুধবার রাতে তাঁর ওপর হামলা হয়। আগুন লাগানোর পর তিনি পাশের একটি পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এতে আগুন কিছুটা নিভলেও তাঁর মাথা ও মুখ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। হামলাকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
প্রথমে তাঁকে নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাঁকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়ার প্রস্তুতিতে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁর এক চোখে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।
খোকন ও সীমা দাসের তিন সন্তান রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখতে অন্তত ছয় ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়েছে।
হাসপাতালে কথা বলার সময় সীমা দাস বলেন, আমরা হিন্দু। আমরা শুধু শান্তিতে থাকতে চাই। যারা হামলা করেছে তারা মুসলমান বলে জানা গেছে। পুলিশ তাদের ধরার চেষ্টা করছে। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।
হাসপাতালে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন মুসলমান ব্যক্তি জানান, তিনি পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং বিষয়টি সাম্প্রদায়িক হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান। তবে দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ধারাবাহিক হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তদন্ত চলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
গত সপ্তাহে ভারত সরকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়েছে, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
তবে খোকন চন্দ্র দাসের ওপর হামলার ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, বাস্তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং সহিংসতার এই ধারার অবসান কবে হবে।
















