ঢাকায় এক অপ্রত্যাশিত করমর্দন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিকের মধ্যে প্রকাশ্যে হাত মেলানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৬ সালে কি ভারত ও পাকিস্তান আবার সীমিত পরিসরে হলেও সংলাপে ফিরতে পারে।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে এই করমর্দনের ঘটনা ঘটে। সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জয়শঙ্কর নিজে এগিয়ে গিয়ে আয়াজ সাদিকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পাকিস্তানের শাসক দল মুসলিম লিগ নওয়াজের জ্যেষ্ঠ এই নেতা পরে এক বেসরকারি টেলিভিশনকে জানান, ভারতীয় মন্ত্রী হাসিমুখে এগিয়ে এসে তাঁকে অভিবাদন জানান এবং নিজের পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও উল্লেখ করেন।
এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকেও করমর্দনের ছবি প্রকাশ করা হয়। অনেকের চোখে এটি সাম্প্রতিক অতীতের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সঙ্গে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। কারণ এর আগে ক্রীড়াঙ্গনেও দুই দেশের মধ্যে প্রকাশ্য সৌজন্য বিনিময় বন্ধ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই করমর্দন সামান্য হলেও প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। পাকিস্তানে এটিকে সম্পর্কের বরফ গলবার ক্ষুদ্র ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইসলামাবাদের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সৈয়দ বলেন, যুদ্ধের পর এমন ন্যূনতম সৌজন্য বিনিময়ও স্বাগত জানানোর মতো বিষয়। তাঁর মতে, কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান দেখানোই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রথম ধাপ।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে গেছে। গত এপ্রিলে ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহেলগামে হামলায় ২৬ বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। ভারত এ ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং ছয় দশকের পুরোনো সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করলেও মে মাসে দুই দেশ চার দিনব্যাপী ভয়াবহ বিমান সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার করমর্দনকে কেউ কেউ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক সরদার মাসুদ খান বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন পদক্ষেপ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এটি ভবিষ্যতে সীমিত আকারে হলেও যোগাযোগের পথ খুলে দিতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের গণমাধ্যমের কিছু বিশ্লেষক বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত না করার পরামর্শ দিয়েছেন। হিন্দুস্তান টাইমসের পররাষ্ট্র সম্পাদক রেজাউল হাসান লস্কারের মতে, একই কক্ষে উপস্থিত দুই শীর্ষ নেতা সৌজন্য বিনিময় করেছেন মাত্র। তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনার ছবি ভারতীয় সূত্র থেকে নয়, বরং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকেই বেশি প্রচারিত হয়েছে।
সবচেয়ে বড় জটিলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিন্ধু পানি চুক্তি। পাকিস্তান বলছে, এই চুক্তি স্থগিত থাকলে দেশটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খানের মতে, ভারত যদি চুক্তিতে ফেরার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটি আস্থার বড় পদক্ষেপ হবে। তবে ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় তা সহজ নয়।
এদিকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থান সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী হয়েছে বলে মত অনেকের। বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের পর ইসলামাবাদ ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ২০২৬ সালে কি ভারত ও পাকিস্তান অন্তত ন্যূনতম সংলাপে ফিরবে। বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সৈয়দের মতে, উভয় দেশের স্বার্থেই সীমিত যোগাযোগ জরুরি। তিনি বলেন, নিয়মকানুন ও সীমারেখা নির্ধারণ করে হলেও একটি প্রাথমিক সংলাপ কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে অনেকেই এখনো সন্দিহান। মে মাসের সংঘাতের তিক্ততা কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন তারা। তবুও ঢাকায় সেই করমর্দন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। সম্পর্ক কি চরম বৈরিতার জায়গায় আটকে থাকবে, নাকি ২০২৬ সালে হলেও ধীরে ধীরে আলোচনার পথে ফিরবে দুই প্রতিবেশী দেশ।
















