ভিডিও গেম শিল্প বরাবরই অনিশ্চিত। এক বছর আগেও যদি কেউ বলত, একটি অচেনা ফরাসি স্টুডিও বছরের সেরা গেম জিতবে, ব্যাটলফিল্ড ৬ বিক্রির তালিকায় কল অব ডিউটিকে ছাড়িয়ে যাবে কিংবা সৌদি আরব গেমিং জায়ান্ট ইলেকট্রনিক আর্টস কিনে নেবে, তাহলে অনেকেই সন্দেহ করতেন।
তাই আগামী বছরে কী ঘটবে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ২০২৬ সালে ভিডিও গেমপ্রেমীদের নজর রাখার মতো কিছু বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বড় গেম মুক্তি, বড় ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও বড় বিতর্ক—সব মিলিয়েই বছরটি হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, জিটিএ ৬ কি সত্যিই ২০২৬ সালে মুক্তি পাবে। দীর্ঘ অপেক্ষা, একাধিকবার তারিখ পেছানো এবং নতুন ট্রেলার প্রকাশের পরও গেমটি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। বর্তমানে ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ১৯ নভেম্বর মুক্তির কথা বলা হলেও আবার দেরি হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকাশক টেক-টু আত্মবিশ্বাসী হলেও রকস্টার স্টুডিওতে অভিজ্ঞ কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে গেমটি বের হলে তা যে রেকর্ড ভাঙবে, তা প্রায় নিশ্চিত।
২০২৬ সালের শুরুতেই বেশ কয়েকটি বড় গেম মুক্তি পাবে। ফেব্রুয়ারিতে আসছে ক্যাপকমের রেসিডেন্ট ইভিল সিরিজের নবম মূল কিস্তি রেসিডেন্ট ইভিল রিকুইয়েম। এপ্রিল মাসে একই প্রতিষ্ঠানের প্রাগমাটা এবং সনির প্লেস্টেশন এক্সক্লুসিভ সারোস বাজারে আসার কথা। শরতে ইনসমনিয়াক স্টুডিওর সুপারহিরো গেম উলভারিন মুক্তি পেতে পারে। মে মাসে হিটম্যান নির্মাতাদের জেমস বন্ড গেম ০০৭ ফার্স্ট লাইট প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিন্টেন্ডো সুইচ ২-এর সফল সূচনার পর কোম্পানিটি গতি ধরে রাখতে চাইবে। পোকোপিয়া এবং এলডেন রিং নির্মাতাদের মাল্টিপ্লেয়ার গেম দ্য ডাস্কব্লাডস নজর কাড়তে পারে। যদিও এখনো নতুন মারিও বা জেলডা গেমের ঘোষণা আসেনি, নিন্টেন্ডোর অতীত অভিজ্ঞতায় শেষ মুহূর্তে বড় চমক অস্বাভাবিক নয়।
মাইক্রোসফটও ২০২৬ সালে ফেবল ও গিয়ার্স অব ওয়ার: ই-ডে মুক্তির পরিকল্পনা করছে। এক্সবক্স ব্র্যান্ডের ২৫ বছর পূর্তিকে ঘিরে বড় ঘোষণার সম্ভাবনাও রয়েছে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক স্টুডিও বন্ধ, গেম পাসের দাম বৃদ্ধি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কনসোলে এক্সবক্স গেম ছাড়ার সিদ্ধান্তের পর সমালোচনা সামলাতে।
বড় প্রকাশকদের বাইরে স্বাধীন গেম নির্মাতাদের দিক থেকেও চমক আসতে পারে। এর মধ্যে আর্কেড ঘরানায় অনুপ্রাণিত স্কোরভিত্তিক গেম র্যাককয়েনকে অনেকেই নজরে রাখছেন।
২০২৬ সালে হার্ডওয়্যার বাজারেও চাপ বাড়তে পারে। র্যাম বা র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরির দাম বেড়ে যাওয়ায় গেম কনসোল ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বড় র্যাম নির্মাতারা ভোক্তা বাজার থেকে সরে যাচ্ছে। এর প্রভাব নিন্টেন্ডো সুইচ ২ বা ভবিষ্যতের স্টিম মেশিনের দামে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যদিও এখনো গেম কোম্পানিগুলো এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
গেম উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রশ্নেও বিতর্ক থামেনি। বহু চাকরি ছাঁটাইয়ের প্রেক্ষাপটে জেনারেটিভ এআই নিয়ে কর্মী ও খেলোয়াড়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কিছু স্টুডিও ধারণা তৈরি বা প্রাথমিক নকশায় এআই ব্যবহার করলেও চূড়ান্ত গেমে মানব সৃজনশীলতাকেই গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছে। তবে প্রযুক্তিটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে এবং নতুন বিতর্কের সম্ভাবনাও রয়েছে।
২০২৬ সালের আরেক বড় ঘটনা হতে যাচ্ছে ইলেকট্রনিক আর্টসকে সৌদি নেতৃত্বাধীন বিনিয়োগ গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি। প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি গেমিং জগতে বড় আলোড়ন তুলেছে। সৌদি আরব একে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখালেও সমালোচকেরা একে ভাবমূর্তি পরিষ্কারের চেষ্টা বলে মনে করছেন। বিশেষ করে দ্য সিমসের মতো এলজিবিটি-সমর্থিত গেম সিরিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইএ জানিয়েছে, তাদের গেম সবসময়ই আত্মপ্রকাশের নিরাপদ জায়গা হিসেবে থাকবে। তবে ঋণের চাপ ও সম্ভাব্য কর্মী ছাঁটাই নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল ভিডিও গেম শিল্পের জন্য হতে যাচ্ছে বড় মুক্তি, বড় বিতর্ক ও বড় পরিবর্তনের বছর। গেমপ্রেমীদের জন্য তাই বছরজুড়েই চোখ রাখার মতো অনেক কিছু থাকছে।
















