সোমালিল্যান্ডকে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিবাদে সোমালিয়াজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলের এই সিদ্ধান্তের পর রাজধানী মোগাদিশুসহ দেশের বিভিন্ন শহরে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
মঙ্গলবার সকালে মোগাদিশুর প্রধান ফুটবল স্টেডিয়াম ও বিমানবন্দর এলাকার আশপাশে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের পক্ষে স্লোগান দেন এবং ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানান।
মোগাদিশুর পাশাপাশি বাইদোয়া, ধুসামারেব, লাস আনোদ, হোবিও এবং দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচির সময় সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ইস্তাম্বুলে সফরে ছিলেন। এর আগে তিনি প্রতিবেশী জিবুতিতেও যাত্রাবিরতি করেন।
সোমালিয়া ও তুরস্কের মধ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে তুরস্ককে ইসরায়েলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সোমালিল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের শহর বোরামায়ও তুলনামূলক ছোট পরিসরে বিক্ষোভ হয়েছে। ওই এলাকার জনগণের মধ্যে সোমালিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত মনোভাব থাকলেও ইসরায়েলের স্বীকৃতির বিরোধিতা স্পষ্ট ছিল।
১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধের পর সোমালিল্যান্ড একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। নিজস্ব মুদ্রা, পাসপোর্ট ও সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও সোমালিয়া সরকার অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে।
গত শুক্রবার ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি আব্রাহাম চুক্তির ধারাবাহিকতায় নেওয়া পদক্ষেপ, যার মাধ্যমে তারা কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল।
এর পরপরই প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ সোমালিল্যান্ডের নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারসংলগ্ন এই ভূখণ্ড যেন অন্য দেশের বিরুদ্ধে কোনো কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত না হয়।
এদিকে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ঘোষণা দিয়েছে, সোমালিল্যান্ডে ইসরায়েলের কোনো উপস্থিতি থাকলে সেটিকে তারা সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
সোমালিল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আবদিরাহমান মোহামেদ আবদুল্লাহি অবশ্য বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি কোনো দেশের জন্য হুমকি নয়। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া বরং বিভাজন দীর্ঘায়িত করছে।
ইসরায়েলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোমালিয়ায় বিরল রাজনৈতিক ঐক্য দেখা গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব একযোগে এর নিন্দা জানিয়েছে।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে গঠিত ন্যাশনাল কনসালটেটিভ কাউন্সিল এই স্বীকৃতিকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে জানায়, এটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরজুড়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
চারটি ফেডারেল রাজ্য সমন্বিত বিবৃতিতে সিদ্ধান্তের নিন্দা জানালেও পন্টল্যান্ড ও জুবাল্যান্ড এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্য দেশও ইসরায়েলের এই স্বীকৃতির সমালোচনা করেছে। জরুরি বৈঠকে তারা সতর্ক করে বলেছে, এর প্রভাব গাজায় ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ হিসেবে প্রকাশ্যে নিন্দা জানায়নি, যদিও তারা বলেছে সোমালিল্যান্ড বিষয়ে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত।
জাতিসংঘে সোমালিয়ার রাষ্ট্রদূত আবু বকর দাহির ওসমান বলেন, এই স্বীকৃতি সোমালিয়াকে খণ্ডিত করার প্রচেষ্টা এবং গাজার ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের আশঙ্কা তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপ প্রতিনিধি ট্যামি ব্রুস বলেন, ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অধিকার রয়েছে, তবে ওয়াশিংটন সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি।
জাতিসংঘে ইসরায়েলের উপ রাষ্ট্রদূত জোনাথন মিলার বলেন, এটি সোমালিয়ার বিরুদ্ধে কোনো বৈরী পদক্ষেপ নয় এবং অন্যান্য দেশকেও একই পথে হাঁটার আহ্বান জানান।
সোমালিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী ওমর নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
















