দেড় দশক পর ফিরছেন বিএনপির কাণ্ডারি; বিনিয়োগে আশার আলো এবং নয়া দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নয়া দিল্লিও এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের অনমনীয় অবস্থান পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের ফেরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন মাইলফলক হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ঢাকা
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা তা পূরণ করার পথে বড় পদক্ষেপ। বিএনপির এই শীর্ষ নেতার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে উৎসবের আমেজ বিরাজ করলেও এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গভীরতা অনেক বেশি।
বিনিয়োগকারীদের আস্থার নতুন ‘প্যারামিটার’
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর মতে, তারেক রহমানের ফেরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ‘কনফিডেন্স বুস্টার’। বিডা চেয়ারম্যানের মতে, এটি দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত একটি ফ্রেমওয়ার্ক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পছন্দ করেন; তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি সেই নিশ্চয়তা দেবে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
ভারত কী ভাবছে? পরিবর্তিত সম্পর্কের মেরুকরণ
তারেক রহমানকে নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের যে অস্বস্তি ছিল, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীতে তাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নয়া দিল্লির কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশে টেকসই স্থিতিশীলতার জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা অপরিহার্য।
- দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা: উত্তর-পূর্ব ভারতের (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তার প্রশ্নে তারেক রহমান বরাবরই আশ্বস্ত করেছেন যে বাংলাদেশের মাটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
- চরমপন্থা দমন: জামায়াত-এনসিপি জোটের এই উত্তাল সময়ে তারেক রহমানের ‘মধ্যপন্থি’ ও ‘উদার গণতান্ত্রিক’ ইমেজ ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
- অর্থনৈতিক কানেক্টিভিটি: ভারত বুঝতে পারছে যে, বাংলাদেশে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্টের সুবিধা বজায় রাখতে একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজন, যেখানে তারেক রহমানের অবস্থান অত্যন্ত ইতিবাচক।
‘নতুন বাংলাদেশ’ ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
তারেক রহমান ইতিমধ্যে ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা দিয়ে দেশবাসীর মন জয় করেছেন। তাঁর ফিরে আসা মানে কেবল দলের হাল ধরা নয়, বরং দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা এবং তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর সংযোগ তাঁকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বড় চ্যালেঞ্জ: বিচারহীনতা ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র
তবে ফেরার পথটি একেবারে নিষ্কণ্টক নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া অসংখ্য মিথ্যা মামলা ও ফরমায়েশি সাজা বাতিল করার আইনি প্রক্রিয়া যেমন চলছে, তেমনি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করাও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দেশের আপামর জনতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর ফেরার পথকে সুগম করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একাধিপত্য ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মধ্যে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করবে। এটি কেবল একটি দলের নেতার ফেরা নয়, বরং বাংলাদেশের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক চূড়ান্ত বিজয়।
















