ভেনেজুয়েলাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়ার মধ্যে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সর্বশেষ এক হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই হামলার মধ্য দিয়ে সেপ্টেম্বরের পর থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০০ জনে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) বুধবার জানায়, ‘সাউদার্ন স্পিয়ার’ নামে পরিচালিত অভিযানের অংশ হিসেবে একটি নৌযানে হামলা চালানো হয়। তাদের দাবি, নৌযানটিতে থাকা চারজন ব্যক্তি ‘নার্কো-সন্ত্রাসী’ ছিলেন। তবে নৌযানটি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল—এমন দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
সাউথকমের বিবৃতিতে বলা হয়, নৌযানটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি পরিচিত মাদক পাচার রুট দিয়ে চলাচল করছিল এবং অবৈধ কার্যক্রমে যুক্ত ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে নৌযানটি ধ্বংস হতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে চালানো এই হামলার ফলে সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ২৬টি নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০০ জনে দাঁড়িয়েছে বলে ওয়াশিংটন স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ ঠেকাতেই এই অভিযান প্রয়োজন।
এদিকে কংগ্রেসে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা নীতির বিরোধিতা করে আনা দুটি প্রস্তাব বুধবার হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে অল্প ব্যবধানে নাকচ হয়ে গেছে। প্রথম প্রস্তাবে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছিল। ভোটে এটি ২১৩-২১১ ব্যবধানে পরাজিত হয়। আরেকটি প্রস্তাবে পশ্চিম গোলার্ধে প্রেসিডেন্ট ঘোষিত কোনো ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের’ বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়, সেটিও ২১৬-২১০ ভোটে বাতিল হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় আকারের সামরিক সমাবেশ চলছে। হাজারো সেনা, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং একটি পারমাণবিক চালিত সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে অপসারণের হুমকি দিয়ে আসছেন।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাভুক্ত সব তেলবাহী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধের নির্দেশ দেন। কারাকাস এই পদক্ষেপকে ‘কুৎসিত হুমকি’ বলে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করে, এর উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে স্কিপার নামের একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে এবং সেটিকে টেক্সাসে নিয়ে গিয়ে তেল খালাস করা হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, নৌ অবরোধ ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার নৌবাহিনী তেলবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে বন্দর ছাড়ার ব্যবস্থা নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নেতা ও জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জাতিসংঘকে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে রক্তপাত ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মেক্সিকোর অবস্থান স্পষ্ট।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও ট্রাম্পের লাতিন আমেরিকা নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপের ওপর জোর দেন। ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট মাদুরোও জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের নিন্দা জানিয়ে একে ‘উপনিবেশবাদী হুমকির নতুন ধাপ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
















