পূর্ব গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) দক্ষিণ কিভু প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর উভিরায় এম২৩ বিদ্রোহীদের দখলের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে শুরু করেছে। কয়েক দিনের সংঘাত ও আতঙ্কের পর স্থানীয় বাসিন্দারা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হতে শুরু করেছেন, যদিও শহরজুড়ে এখনও অস্থিরতার ছাপ রয়ে গেছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে উভিরা দখলের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তি কার্যত হুমকির মুখে পড়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, রুয়ান্ডার সমর্থনে এই অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার বলেছেন, পূর্ব ডিআর কঙ্গোতে রুয়ান্ডার ভূমিকা শান্তি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
আঞ্চলিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বুকাভু ও উভিরার মধ্যবর্তী এলাকায় চলমান সহিংসতায় অন্তত ৪০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। বর্তমানে দুটি শহরই এম২৩ বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
উভিরায় উপস্থিত একমাত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদক আলাঁ উয়াকানি জানিয়েছেন, লেক তানজানিকার উত্তর প্রান্তের এই বন্দরনগরীতে এক ধরনের অস্বস্তিকর শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। বিদ্রোহীরা প্রবেশের আগেই সরকারপন্থি বাহিনী ও তাদের মিত্র মিলিশিয়া ‘ওয়াজালেন্দো’ শহর ছাড়তে শুরু করে।
বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রার সময় যারা পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ফিরছেন। তবে বেশিরভাগ দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ রয়েছে। উয়াকানি বলেন, মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে, তাদের ধারণা ভয়াবহ সময়টা পেরিয়ে গেছে। তবে শহরের বিভিন্ন জায়গায় তীব্র সংঘর্ষের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট।
উভিরার বাসিন্দা বিয়েনভেনু মাতুমাবিরে জানান, সংঘর্ষ শুরুর সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন। পাশের গ্রাম থেকে গুলির শব্দ শুনে তিনি কাজ বন্ধ করেন। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। আরেক বাসিন্দা বাওলেজে বেইনফাইত বলেন, বিদ্রোহীরা এখনো সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে না, তবে আগামী দিনগুলো কী হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এম২৩ বিদ্রোহীদের মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা উভিরাকে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ থেকে মুক্ত করেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ব কঙ্গোর তুতসি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এই অভিযান চালাচ্ছে। চলতি বছরের শুরু থেকে অঞ্চলটিতে সহিংসতা নতুন করে বেড়েছে।
২ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এই অভিযানে দক্ষিণ কিভু প্রদেশে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে জাতিসংঘের স্থানীয় অংশীদার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
দক্ষিণ কিভুর কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, রুয়ান্ডার বিশেষ বাহিনী ও বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধারা উভিরায় সক্রিয় রয়েছে, যা ওয়াশিংটন ও দোহায় হওয়া আগের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ রুয়ান্ডাকে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ করেন।
ওয়াল্টজ বলেন, ২০২১ সালে এম২৩ পুনরুত্থানের পর থেকে রুয়ান্ডা কৌশলগতভাবে এই গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং চলতি মাসের শুরুতে কঙ্গোতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে পাঁচ থেকে সাত হাজার রুয়ান্ডান সেনা সক্রিয় ছিল।
রুয়ান্ডা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত পাল্টা অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে কঙ্গোই। তবে কিগালি স্বীকার করেছে যে, তারা পূর্ব কঙ্গোতে সেনা মোতায়েন রেখেছে, যা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থে, বিশেষ করে ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর কঙ্গোতে আশ্রয় নেওয়া হুতু মিলিশিয়াদের মোকাবিলায়।
উভিরার পতনে প্রতিবেশী বুরুন্ডিতেও উদ্বেগ বেড়েছে। দেশটি ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় সেনা মোতায়েন করেছে। বুরুন্ডির জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত সতর্ক করে বলেছেন, সংযমেরও একটি সীমা আছে এবং হামলা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানো কঠিন হবে। সাম্প্রতিক সহিংসতায় ৩০ হাজারের বেশি শরণার্থী বুরুন্ডিতে আশ্রয় নিয়েছে।
ডিআর কঙ্গোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘকে রুয়ান্ডার বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি চলতে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খনিজসমৃদ্ধ পূর্ব কঙ্গোতে শতাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এই অঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটে পরিণত করেছে, যেখানে সাত মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। এম২৩ গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া কঙ্গো-রুয়ান্ডা আলোচনার অংশ নয়; তারা কাতারের উদ্যোগে কঙ্গো সরকারের সঙ্গে আলাদা আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।















