পূর্ব কঙ্গোর যুদ্ধবিধ্বস্ত আকাশের নিচে আবারও মানুষের আর্তনাদ। দক্ষিণ কিভুর কৌশলগত শহর উভিরা দখলে নেওয়ার পর এম২৩ বিদ্রোহীদের উপস্থিতি যেন আরও গভীর অন্ধকার নামিয়ে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সদ্যস্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পরও যুদ্ধ থামেনি—উল্টো, মানুষের ঘরবাড়ি, স্বপ্ন আর পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে ছিটকে পড়েছে সীমান্তের পথে।
বুধবার যে শহরটি দখল করেছে এম২৩, সেটিই এখন লেক টাঙ্গানিয়কার তীর ঘেঁষা হতশ্রী নীরবতার প্রতীক। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে বলেছিলেন “ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি”—কিন্তু তার মাত্র এক সপ্তাহ পরই উভিরা বিদ্রোহীদের হাতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
প্রথম আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে আল জাজিরা যখন শহরে ঢোকে, দেখা যায় ঘরছাড়া মানুষ সতর্কভাবে ফিরে আসছে, আর রাস্তাজুড়ে পাহারা দিচ্ছে ভারী অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরা। তার আগের দিন এম২৩ যোদ্ধারা শহরের অলিগলিতে অভিযানে বের হয়—সরকারি সেনা ও “ওয়াজালেন্দো” নামে পরিচিত স্থানীয় মিলিশিয়াদের শেষ উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করতে।
অন্যদিকে রুয়ান্ডার রুসিজি জেলার নিয়ারুশিশি শরণার্থী শিবিরে ৪০ বছর বয়সী আকিলিমালি মিরিন্দির চোখে শুধু ধ্বংস আর মৃত্যু। দশ সন্তানের মধ্যে তিনজনকে কোলে নিয়ে তিনি প্রাণে বাঁচতে দৌড়েছিলেন, পেছনে রয়ে গেছে বাকি সাত সন্তান আর স্বামী। বাড়ি বাঁচেনি, বাঁচেনি তাদের সুরক্ষা। “আমি জানি না তারা কোথায় আছে… পথে পথে শুধু লাশ পড়ে ছিল,” কাঁপা কণ্ঠে বলেন তিনি।
ডিসেম্বরের শুরু থেকে দক্ষিণ কিভুতে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৪১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে, নারী-শিশুও রেহাই পায়নি। প্রায় দুই লাখ মানুষ ছুটছে সীমান্তের দিকে—ভয়ে, ক্ষুধায়, আর বাঁচার আকাঙ্ক্ষায়।
উভিরা শহরটি দক্ষিণ কিভু প্রদেশের অস্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে বিদ্রোহীরা বBukavu দখল করার পর এখানেই সরকার কার্যক্রম সরিয়েছিল, আর এখন সেটিও এম২৩-এর হাতে।
শুক্রবার শহরে গিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদক আলাঁ উয়াকানি দেখেছেন লাল ক্রসের দলগুলো ব্যস্তভাবে রাস্তার পাশ থেকে লাশ সংগ্রহ করছে। উভিরার পথে ভাঙাচোরা সামরিক যান, ছড়িয়ে থাকা পোড়া দেহ—পথের প্রতিটি মোড় যেন মৃত্যুর একেকটি সাক্ষ্য।
শরণার্থীরা জানাচ্ছেন, চারদিক থেকে গোলাবর্ষণ হচ্ছিল। “বোমা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে পড়ছিল। আমাদের জমি, আমাদের পরিবার—সব রেখে পালাতে হয়েছে,” বলেন ৬৭ বছরের থমাস মুতাবাজি।
জানুয়ারিতে বুরুন্ডিতে পালিয়ে যাওয়া জ্যানেট বেন্দেরেজা ফের দেশে ফিরে দেখেন—শহরের নিয়ন্ত্রণ ইতোমধ্যে এম২৩-এর হাতে। এবার নতুন বোমাবর্ষণে আবার ছুটতে হয়েছে, চার সন্তানকে নিয়ে দৌড়ে বাঁচলেও স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন।
৫৬ বছরের ওলিনাবাঙি কায়িবান্দা দেখেছেন—তার গর্ভবতী প্রতিবেশী দুই সন্তানসহ মুহূর্তে ছাই হয়ে গেল বোমার আঘাতে। “শিশুরাও মরছিল… তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, বাঁচতে হলে পালাতেই হবে।”
এম২৩ মুখপাত্র লরেন্স কানিউকা বলেছে, উভিরা “সম্পূর্ণ মুক্ত”। কিন্তু সেই কথার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও শুরু হয়েছে সংঘর্ষ—ডিসেম্বর ৪ তারিখে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স টশিসেকেদি, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামে ও ট্রাম্পের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত চুক্তির বাস্তবতা প্রথম সপ্তাহেই ভেঙে পড়েছে।
কঙ্গো সরকার অভিযোগ করছে, রুয়ান্ডা বিশেষ বাহিনী ও বিদেশি ভাড়াটে যোদ্ধা পাঠিয়ে উভিরার যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছে—যা ওয়াশিংটন ও দোহা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
যুক্তরাষ্ট্র রুয়ান্ডাকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও প্রেসিডেন্ট কাগামে পাল্টা দাবি করছেন—২০,০০০ বুরুন্ডিয়ান সেনা কঙ্গোর বিভিন্ন অংশে অবস্থান করছে এবং মিনেমবু এলাকায় তারা বেসামরিকদের ওপর গোলাবর্ষণ করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন, এ সংঘর্ষ দ্রুতই আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। তার ভাষায়—“এই আগুন এখনই না নেভালে, পুরো অঞ্চল জ্বলে উঠবে।”
উভিরার রাস্তায় এখনো মাটির নিচে দাফন করা হচ্ছে অচেনা মানুষের দেহ। আর শরণার্থী শিবিরে কাঁদছে মায়েরা, যারা জানে না তাদের সন্তানরা বেঁচে আছে নাকি সেই মৃত্যুর পথেই পড়ে আছে—কেউ তুলে নিতে পারেনি।















