পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বিনিনে ৭ ডিসেম্বর সৈন্যরা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে প্রেসিডেন্ট পাত্রিস তালোঁকে অপসারণ, সংবিধান স্থগিত এবং সীমান্ত বন্ধের ঘোষণা দেয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল প্যাসকাল টিগ্রির নেতৃত্বে “মিলিটারি কমিটি ফর রিফাউন্ডেশন” নিজেদের ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দিলে অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, এবং বহু পর্যবেক্ষক এক পরিচিত দৃশ্যের আশঙ্কা করতে থাকেন—জোরপূর্বক পদত্যাগ, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর নিন্দা।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলাসানে সাইদু জানান, অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট তালোঁ টেলিভিশনে আবার উপস্থিত হন এবং অন্তত ১৪ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার কথা জানানো হয়।
যদিও সরকার দাবি করছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে, বিশ্লেষকদের মতে এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ। তালোঁর শাসনামলেই বিনিনের গণতান্ত্রিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে।
২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসার আগে বিনিন শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাস এবং ১৯৯০ সালের ন্যাশনাল কনফারেন্সের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য পরিচিত ছিল। তালোঁ শুরুতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭-১৮ সালে তিনি সাংবিধানিক আদালতে অনুগত বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে আদালতকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসেন। ২০১৯ সালে নতুন নির্বাচনী আইন প্রণয়ন করে বিরোধীদলীয় তালিকাগুলোকে বাতিল করা হয়, ফলে সেই নির্বাচনে কেবল দুটি সরকার সমর্থক দলই অংশ নিতে পারে।
একই বছরে আমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নির্বিচারে গ্রেপ্তার, সাংবাদিক দমনে সরকারের ভূমিকা ও সহিংসতায় কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করে। জনরোষে ভোটার উপস্থিতি নেমে আসে মাত্র ২৭ শতাংশে।
২০২১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধীদের বহু নেতা হয় কারাগারে, নয়তো নির্বাসনে থাকায় নির্বাচন কার্যত প্রতিযোগিতাহীন হয়ে পড়ে। পরে বিরোধী নেত্রী রেকিয়া মাদুগু এবং শিক্ষাবিদ জোয়েল আইভোর মতো রাজনীতিবিদদের বিশেষ আদালতের রায়ে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়।
অভ্যুত্থান চেষ্টার কয়েক সপ্তাহ আগে ১৬ নভেম্বর সংসদ সাত বছর মেয়াদী নতুন ব্যবস্থা অনুমোদন করে এবং আংশিকভাবে মনোনীত সিনেট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিরোধীরা এটিকে ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের নতুন উদ্যোগ হিসেবে আখ্যা দেয়।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মালি, নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোতে সেনা হস্তক্ষেপের প্রবণতা বেড়েছে। আফ্রোবারোমিটারের জরিপ বলছে, ক্ষমতার অপব্যবহার হলে অর্ধেকের বেশি আফ্রিকান নাগরিক সামরিক হস্তক্ষেপকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে সেনাবাহিনী সেই শূন্যতা কাজে লাগায়, কিন্তু সমাধান আনে না। বিনিনেও সেই লক্ষণ স্পষ্ট। আফ্রিকান ইউনিয়ন ও ইকোওয়াস অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার নিন্দা করলেও কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নেয়নি।
কর্তৃপক্ষ বলছে, অভ্যুত্থানকারীরা সরকারের নিরাপত্তাহীনতা মোকাবেলায় ব্যর্থতা, উত্তরাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকি এবং জনপ্রিয় না হওয়া আর্থিক নীতির কারণে এই পদক্ষেপ নেয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বিশেষ আদালত সংস্কার, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং সাংবিধানিক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। তালোঁ ক্ষমতায় এসে যে গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রায় এক দশক পর তার সেই ভাবমূর্তি পাল্টে গিয়ে একদলীয় নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি নির্ভর শাসন ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে।
তবে এখনও বিনিনে সংস্কারের সুযোগ রয়েছে—যদিও সেই জানালা খুব অল্প সময়ের জন্য খোলা।















