সুদানে চলমান গৃহযুদ্ধ খাদ্যসহ জরুরি সহায়তা পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে, ফলে লাখো মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে—এমন কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটি বলছে, দেশজুড়ে বিশাল মানবিক বিপর্যয় দ্রুত গভীরতর হচ্ছে।
রবিবার আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডব্লিউএফপির উপপরিচালক কার্ল স্কাউ জানান, তাদের সংস্থা বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে সহায়তা দিচ্ছে, যার মধ্যে ২০ লাখ সবচেয়ে দুর্গম এলাকায় আটকে থাকা লোকজন। কিন্তু সামগ্রিক চাহিদা তার বহু গুণ বেশি।
স্কাউ বলেন, দেশে ২ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ভুগছেন এবং অন্তত ৬০ লাখ মানুষ অনাহারের দোরগোড়ায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এটি বিশাল সংকট, আর আমরা যা করতে পারছি তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও মোটেই যথেষ্ট নয়।”
যুদ্ধের কারণে সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত
ডব্লিউএফপি এয়ারড্রপ, ডিজিটাল নগদ সহায়তা এবং অবরুদ্ধ এলাকার কাছে কনভয় পাঠানোসহ সব ধরনের উপায় চেষ্টা করেও বেশ কিছু এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি বলেন, উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশের—যা ১৮ মাস অবরুদ্ধ থাকার পর অক্টোবর মাসে দ্রুত সমর্থন বাহিনী (আরএসএফ)-এর দখলে যায়—এবং পশ্চিম কর্ডোফানের বাবনুসার মতো জায়গায় সহায়তা পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এসএএফ (সরকার–সমর্থিত সেনাবাহিনী) অবশ্য বাবনুসা পতনের খবর অস্বীকার করেছে।
কর্ডোফান অঞ্চলে নজর দিতে আহ্বান
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কর্ডোফান অঞ্চলে এসএএফ ও আরএসএফ-এর লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। স্কাউ বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কর্ডোফান অঞ্চলের দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যাতে এল-ফাশেরের মতো আরেকটি মানবিক বিপর্যয় ঠেকানো যায়।
এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার টুর্কও একই সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, কর্ডোফানেও এল-ফাশেরের মতো গণহত্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘ জানায়, ইতোমধ্যে দারফুর এবং কর্ডোফানের বেশ কিছু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে সুদানের অভিযোগ
দোহা ফোরামে সুদানের বিচারমন্ত্রী আবদুল্লাহ দিরিফে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার অকার্যকারিতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, সুদান ১২ হাজারের বেশি মানবিক কর্মীর ভিসা অনুমোদনসহ সব ধরনের সহায়তা–পদ্ধতি চালু রেখেছে, কিন্তু “জাতিসংঘ তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে”।
তিনি অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত আরএসএফ–কে সমর্থন দিচ্ছে, যা যুদ্ধকে আরও তীব্র করছে। তবে ইউএই এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
জাতিসংঘ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে বেসামরিক নাগরিকদের আক্রমণ থেকে বিরত রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
দক্ষিণ কর্ডোফানে শিশুসহ ১১৬ জন নিহত
একই দিনে দক্ষিণ কর্ডোফানের কালোজি এলাকায় আরএসএফ-এর হামলায় অন্তত ১১৬ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৪৬ জনই শিশু। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, হামলায় একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। আহতদের উদ্ধার করতে গেলে হাসপাতালেও দ্বিতীয়বার হামলা চালানো হয়।
সুদান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে “পুরোপুরি গণহত্যা” বলে আখ্যা দিয়েছে।
স্থানচ্যুত নারী–শিশুর ওপর যৌন সহিংসতা
এদিকে সুদান ডক্টরস নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, এল-ফাশের থেকে পালিয়ে আল-আফাদ শিবিরে আশ্রয় নেওয়া নারী—কমপক্ষে ১৯ জন—আরএসএফ সদস্যদের ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে দুইজন অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন বলেও সংস্থাটি জানিয়েছে।
তারা বলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এসব সহিংসতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব
জাতিসংঘ বলছে, পুরো সুদানে সহিংসতায় ইতোমধ্যে ৯০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
সুদানে চলমান সংকট দ্রুত গভীরতর হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে—এমনই মত মানবিক সংস্থাগুলোর।
















