দোহা, কাতার— মরুর বালুর ওপর যখন বিশ্ব রাজনীতির ছায়া দীর্ঘ হয়, তখন দোহা ফোরামের মঞ্চে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কাল্লাস শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, যুক্তরাষ্ট্রই আজও ইউরোপের সবচেয়ে বড় মিত্র। বাতাসে তখনও ভাসছিল ওয়াশিংটনের কৌশলগত নথির তীব্র সমালোচনার প্রতিধ্বনি, যেখানে ইউরোপকে বলা হয়েছে আত্মবিশ্বাসহীন, এমনকি ‘সভ্যতার অবক্ষয়ের মুখে’—যা বহু মহলে অতিরঞ্জিত বলেই উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
কাল্লাস স্বীকার করেন, কিছু সমালোচনার ভেতরে সত্যের ছায়া থাকতে পারে। তবু তার কণ্ঠে ছিল ঐক্যের আহ্বান তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই চলতে হবে। মতপার্থক্য এসেছে, যায়ও, কিন্তু মূল ভিত্তি অটুট: আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধন রয়ে গেছে মিত্রতা।
সাম্প্রতিক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রে এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে যে, একদিন ইউরোপ বিশ্বাসযোগ্য মিত্রের মর্যাদা হারাতে পারে। এই সুরটি মিল খুঁজে পায় আগের মার্কিন প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ন্যাটো সদস্যদেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে চাপ দিয়েছিল ওয়াশিংটন।
এই যুদ্ধ—যার আগুন জ্বলে উঠেছিল ২০২২ সালে, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের মাধ্যমে—থামাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনে এনেছেন একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা। তার প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ইউক্রেনকে এমন কিছু ভূখণ্ড ছাড়তে বলা হয়েছে, যা রাশিয়া মাঠের লড়াইয়েও পুরোপুরি দখল করতে পারেনি। বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি, যা কিয়েভের বহুদিনের ন্যাটোতে যোগদানের স্বপ্ন পূরণ করে না।
এই খসড়া প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে মস্কোয় পাঁচ ঘণ্টার বৈঠকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার সর্বোচ্চ দাবি ও ভূখণ্ডের দাবিতে আপস করতে প্রস্তুত নন।
ওয়াশিংটন জানিয়েছে, প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে রাশিয়ার ওপর—তারা সত্যিকারের শান্তির পথে হাঁটতে প্রস্তুত কি না, সহিংসতা কমাতে ও হত্যাকাণ্ড বন্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেয় কি না।
দোহায় দাঁড়িয়ে কাল্লাস সতর্ক করে বলেন, ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাদের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করে কোনো স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়। তার ভাষায়, যদি আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করা হয়, তবে সেই একই আগুন আবার জ্বলবে—শুধু ইউক্রেনে নয়, গাজায় নয়, বরং গোটা পৃথিবীর নীরব আকাশে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ইউরোপ অনেকদিন ধরেই নিজের শক্তিকে নিজেই অবমূল্যায়ন করে এসেছে। বিশেষ করে রাশিয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপকে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। তার কথায় ফুটে ওঠে এক কঠিন উপলব্ধি—ভয় নয়, সাহসই ভবিষ্যতের পথ।
যখন বিশ্ব শক্তিগুলোর টানাপোড়েন চলছেই, তখন দোহার মঞ্চ থেকে ভেসে এল একটি কণ্ঠ—ভাঙনের নয়, মিলনের। সমালোচনার মধ্যেও মিত্রতার হাত আঁকড়ে ধরার, এবং যুদ্ধের ছায়ায় দাঁড়িয়েও শান্তির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার এক নীরব প্রতিশ্রুতি।















