তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসের উপকূলঘেঁষা শান্ত উপশহর লা গুলেতে সেই সন্ধ্যায় বাতাস যেন গান গাইছিল। সূর্য অস্তমিত হতেই সেন্ট অগাসটিন অ্যান্ড সেন্ট ফিদেল গির্জার দরজা খুলে বেরিয়ে এলো ভার্জিন মেরির মূর্তি। ডজনখানেক ভক্তের কাঁধে ভর করে যখন সেই মূর্তি চত্বরে পৌঁছাল, উল্লাস, প্রার্থনা আর তিউনিসিয়ার পতাকা নেড়ে শুভেচ্ছায় ভরে গেল চারপাশ।
এটা শুধু একটি ধর্মীয় শোভাযাত্রা নয়, বরং লা গুলেতে বসবাসরত টিউনিসিয়ান, ইউরোপীয় এবং সাব সাহারান আফ্রিকান সম্প্রদায়ের মধ্যে এক অনন্য মিলন। কেউ এসেছেন গভীর বিশ্বাসে, কেউ এসেছেন অভ্যাসে, আর কেউ এসেছেন আপন শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন স্মৃতির টানে।
গির্জার ভেতরের মিসায় অংশ নেওয়া অনেকেই আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আগত অভিবাসী। কঙ্গো থেকে আসা আইজাক লুসাফু বলেন, আজ যেন সবাইকে এক সুতোয় বাঁধিয়ে রেখেছেন মা মেরি।
গির্জার দরজার সামনে জমে ওঠা ভিড়ের উপরে যেন পাহারা দিচ্ছে লা গুলেতে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত ইতালীয় অভিনেত্রী ক্লাওদিয়া কারদিনালের রঙিন দেয়ালচিত্র। স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সেই সময়ের কথা, যখন এই এলাকাটি ছিল হাজারো সিসিলিয়ান জেলে ও পরিবারে পূর্ণ।
মিলেমিশে থাকা ইতিহাস
উনিশ শতকের শেষ দিকে সিসিলি থেকে আসা অভিবাসীদের হাত ধরে লা গুলেতে শুরু হয়েছিল ভার্জিন মেরির এই শোভাযাত্রা। একসময় মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান—সবাই মিলে মেরির মূর্তি গির্জা থেকে সমুদ্র পর্যন্ত নিয়ে যেত, জেলেদের নৌকায় আশীর্বাদ কামনা করত। আকাশে ভেসে উঠত শুভ কামনার চিৎকার, অনেকেই বাতাসে ছুঁড়ে দিতেন ঐতিহ্যবাহী চেচিয়া টুপি।
অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি এই উৎসব কেবল ধর্মীয় নয়, ছিল গ্রীষ্মের চরম উত্তাপ বিদায়ের ইঙ্গিতও। লা গুলেতে জন্ম নেওয়া সিলভিয়া ফিনজি বলেন, মূর্তি যখন সমুদ্রের ধারে যেত, মনে হতো যেন সাগরের রূপ বদলে গেল, গ্রীষ্মের কঠোরতা কমে এলো।
বিচ্ছেদের সময়
২০ শতকের মধ্যভাগে তিউনিসিয়া স্বাধীনতা পাওয়ার পর অধিকাংশ ইউরোপীয় অভিবাসী ফিরে গেলেন নিজেদের দেশে। ১৯৬৪ সালে ভ্যাটিকানের সঙ্গে চুক্তির পর তিউনিসিয়ার গির্জাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় সরকার, বন্ধ হয়ে যায় সকল খ্রিস্টীয় জনউৎসব। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শোভাযাত্রা সীমাবদ্ধ ছিল গির্জার ভেতরে।
ফিরে আসা উৎসব
২০১৭ সালে নতুন অনুমতিতে পুনরায় শুরু হয় শোভাযাত্রা, যদিও ছোট পরিসরে। এ বছরের আয়োজনে অংশ নেয় বিপুলসংখ্যক তরুণ টিউনিসিয়ান মুসলিমও, কারণ ইসলামে মারিয়াম বিশেষ সম্মানের স্থান দখল করে আছেন।
অনেকেই এসেছেন নস্টালজিয়ার ডাকে। ২৬ বছর বয়সী রানিয়া বলেন, ইউরোপীয় অভিবাসীদের ইতিহাস তিউনিসিয়ার স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যদিও এখন অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন।
নতুন অভিবাসীদের পদচিহ্ন
সিসিলিয়ানদের বিদায়ের পর তিউনিসিয়া জায়গা করে দিয়েছে সাব সাহারান আফ্রিকার নতুন অভিবাসীদের। অনেকে কাজের খোঁজে আসেন, আবার কারো স্বপ্ন ইউরোপ পাড়ি দেওয়া। বৈষম্যের মুখোমুখি হলেও তারা গির্জার সবচেয়ে সক্রিয় অংশ, কারণ তাদের বেশিরভাগই খ্রিস্টান।
২০১৭ সালে গির্জায় আঁকা এক দেয়ালচিত্রে দেখা যায় ভার্জিন মেরি আপন আঁচলের নিচে রক্ষা করছেন টিউনিসিয়ান, সিসিলিয়ান এবং আফ্রিকান অভিবাসীদের। চারপাশ ভাসছে বাতাসে উড়ে যাওয়া পাসপোর্টের প্রতীকী চিত্রে, যা অভিবাসীদের ঝুঁকি ও সংগ্রামের গল্প বলে।
তিউনিসের আর্চবিশপ নিকোলা লারনোল্ড বলেন, এই উৎসব এখন শুধু দুই ভূমধ্যসাগরিক তীরের বন্ধনকে নয়, বরং এক বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক মিলনকে চিহ্নিত করে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, মেরি নিজেও ছিলেন এক অভিবাসী, এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বেড়ানো শরণার্থী মা।
অতীতের ছায়া
লা গুলেতের ছোট্ট সিসিলি আজ প্রায় বিলীন। পুরনো ইতালীয় ঘরবাড়ির বেশিরভাগই মুছে গেছে আধুনিক স্থাপনায়। রয়ে গেছে শুধু স্মৃতি আর গির্জা। ২০১৯ সালের হিসেবে তিউনিসিয়ায় মূল সিসিলিয়ান বংশোদ্ভূত ইতালিয়ানের সংখ্যা মাত্র আটশ।
তবুও মাঝে মাঝে স্মৃতি জেগে ওঠে। অল সেন্টস ডেতে কবরস্থানে গেলে দেখা যায়, টিউনিসিয়ান মুসলিমরাও সিসিলিয়ান পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করছেন। মিশ্র বিবাহের কারণে অনেকের শেকড় জড়িয়ে আছে দুই সংস্কৃতিতে।
এক বৃদ্ধা রিতা স্ত্রাজ্জেরা বলেন, এই দৃশ্যগুলোই মনে করিয়ে দেয়—ছোট সিসিলি কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। এটা রয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ে, ঐতিহ্যের গান হয়ে, লা গুলেতের বাতাসে, সেই পুরনো শোভাযাত্রার ধ্বনি হয়ে।
















