সিরিয়ায় এ বছরের শুরুর দিকে উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া রক্তঝরা সংঘর্ষে হাজারো মানুষের মৃত্যুতে যে শোকের রেখা আঁকা হয়েছিল, সেই হত্যাযজ্ঞের প্রথম বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার সিরিয়ার সরকারি বার্তায় জানানো হয়েছে, দীর্ঘ মাসব্যাপী অনুসন্ধানের পর আলেপ্পোর ন্যায়ালয়ে ১৪ জন সন্দেহভাজনকে প্রথমবারের মতো আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে।
এ রক্তাক্ত অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আলাউই সম্প্রদায়, যাদের ঘিরেই মার্চ মাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ঘনিষ্ঠ এই জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত নেমে এসেছিল যখন তার অনুগত সশস্ত্র গোষ্ঠীরা দেশের নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। পাল্টা অভিযানের আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই উন্মত্ততা রূপ নেয় সাধারণ মানুষের প্রতি নির্মম প্রতিশোধে।
কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ১৪ জনের মধ্যে সাতজন আসাদপন্থী আর বাকি সাতজন নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, তাদের বিরুদ্ধে উসকানি, গৃহযুদ্ধ ছড়ানো, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা, হত্যা, লুটতরাজ এবং সশস্ত্র গ্যাং পরিচালনার মতো একগুচ্ছ অভিযোগ আনা হতে পারে। সরকারপন্থী বাহিনীর সাত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রয়েছে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ।
জনগণ এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে সিরিয়ার নতুন শাসকগোষ্ঠী বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আদালত শুরু হতেই বিচারক জাকারিয়া বাক্কার ঘোষণা করেন, “আদালত স্বাধীন, এর সিদ্ধান্ত সার্বভৌম।”
নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শারার জন্য এই বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে আল কায়েদা-সংলগ্ন শক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকা এই নেতা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চেষ্টা করছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি করাতে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের এটাই তার একমাত্র পথ।
তবে বিচার দ্রুত এগোবে বলে সরকারি গণমাধ্যম যে ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা বাস্তবে ঘটেনি। বিচারক পরবর্তী শুনানির তারিখ ঘোষণা করে অধিবেশন মুলতবি করেন।
জুলাইয়ে জাতীয় অনুসন্ধান কমিশন জানায়, তারা কমপক্ষে ১৪২৬ জন মানুষের মৃত্যুর প্রমাণ পেয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ নাগরিক। ২৯৮ জন সন্দেহভাজনের নামও চিহ্নিত করা হয়েছে। কমিশনের হিসেবে এ সহিংসতায় সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর ২৩৮ সদস্য নিহত হন, যাদের ওপর হামলার দায় দেওয়া হয়েছে আসাদপন্থী গোষ্ঠীর ওপর। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই লাখ নিরাপত্তা সদস্য ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়।
কমিশনের দাবি, নতুন সামরিক নেতৃত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে আলাউই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোনো হামলার নির্দেশ দেয়নি। কিন্তু জাতিসংঘের তদন্ত বলছে, সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ শক্তিগুলোর হামলা ছিল বিস্তৃত এবং পরিকল্পিত। অনেক এলাকায় ঘরবাড়িতে ঢুকে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করে আলাউই পুরুষ ও কিশোরদের আলাদা করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়।
যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি। বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও মানুষের হৃদয়ের অন্ধকারে প্রতিদিনই ফিরে আসে সেই রাতের আর্তনাদ, ভাঙা ঘরের ছাই আর হারিয়ে যাওয়া মুখগুলোর স্মৃতি। সিরিয়ায় ন্যায়বিচার কতটা বাস্তব রূপ নেবে, তা সময়ই বলে দেবে।
















