ছোট পার্থক্যে শীর্ষে থাকা ‘গৌরবজনক’ অবস্থান
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযানগুলোতে বিশ্বের প্রায় ১২০টি দেশ অংশগ্রহণ করলেও, বাংলাদেশের অবদান সব সময় আলাদা। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬,৭২২ জন সেনা ও পুলিশ সদস্য বিভিন্ন দেশ ও জটিল অঞ্চলে শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত। তবে এই শীর্ষ অবস্থানটি এখনও খানিকটা সংকটজনক—আমরা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছি।
শান্তির পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথমবারের মতো আইরান-ইরাক অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য শান্তিরক্ষা অভিযানে অংশ নেয়। এরপর ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশ, ১৯৯৩ সালে নৌ ও বিমান বাহিনী যুক্ত হয়।
শান্তিরক্ষা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। ভাষার প্রতিবন্ধকতা, অজানা রোগ, দুঃসাধ্য রাস্তা, খারাপ অবকাঠামো, কঠিন আবহাওয়া, সাংস্কৃতিক বৈষম্য এবং মানসিক চাপ—সবই শান্তিরক্ষীদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। কখনো কখনো এই মিশনগুলিতে রক্ষণাত্মক কাজের পাশাপাশি আত্মরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক পদক্ষেপও নিতে হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে কার্যকরী।
বাংলাদেশের গৌরব ও প্রভাব
গত তিন দশকে, ১,৭০,২৪৩ জন সাহসী বাংলাদেশি নারী-পুরুষ বিভিন্ন সংঘর্ষপ্রবণ দেশে অবদান রেখেছেন। পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা, আত্মত্যাগ, সেবা মনোভাব এবং শৃঙ্খলা বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বিশ্বস্ত এবং সম্মানজনক পরিচয় দিয়েছে।
১৭ জুলাই ২০২০ সালে, বাংলাদেশ আবারও শীর্ষ অবস্থান পুনরুদ্ধার করে যখন ১৬০ জন কুইক রিয়্যাকশন ফোর্স (QRF) কেন্দ্রীয় আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়। বর্তমানের হিসাবে, আমাদের ৬,৭২২ জন সদস্যের সঙ্গে, এথিওপিয়া ও রুয়ান্ডা যথাক্রমে ৬,৬৬২ ও ৬,৩২২ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত।
চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতা
আমরা শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছি সামান্য ব্যবধানে। রুয়ান্ডা ও এথিওপিয়া আমাদের পেছনে ঘনিষ্ঠভাবে রয়েছে। বিশেষ করে এথিওপিয়ার “এক্সপার্ট অন মিশন” সংখ্যা ১০০, যা বাংলাদেশের ২৯-এর তুলনায় বেশি। শুধু সামরিক বাহিনী নয়, আমাদের পুলিশ ইউনিট (FPU) সদস্য নিয়োগেও এগিয়ে থাকতে হবে।
বাংলাদেশি নেতৃত্বের গৌরব
যদিও শীর্ষ শান্তিরক্ষী দেশ আমরা, মিশন কমান্ড লেভেলে অংশ সীমিত। এ বছরের বড় গৌরবের বিষয় হল, মেজর জেনারেল মোঃ মাইন উল্লাহ চৌধুরী বর্তমানে দক্ষিণ সুদানে ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মেজর জেনারেল আবু তায়েব জাহিরুল আলম, মেজর জেনারেল মোঃ হুমায়ুন কবীর এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্বও বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।

ভবিষ্যতের লক্ষ্যমাত্রা
৩৩ বছরের শান্তিরক্ষা যাত্রা থেকে, বাংলাদেশকে আরও বড় অবদান রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে আরও বেশি জেনারেল নিয়োগ, গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অবস্থান আমাদের শীর্ষ অবস্থানকে স্থায়ী করতে সাহায্য করবে। আমরা শান্তি রক্ষা, শান্তি গঠন ও শান্তি বাস্তবায়নে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছি—এটি বজায় রাখতে আমাদের ধৈর্য, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা শুধুমাত্র দেশের মর্যাদা নয়, মানবতার সেবা করছে। সামান্য ব্যবধানের শীর্ষ অবস্থান আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আগামী দিনে আরও প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে পারব।

















