গাজায় এক সপ্তাহজুড়ে ধারাবাহিক হামলায় বহু শিশু, ত্রাণকর্মী ও সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন বসতি স্থাপন, বাড়িঘর ভাঙচুর, জমি দখল এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ৮ জুলাই আল-মাওয়াসি ঘোষিত “মানবিক নিরাপদ অঞ্চল”-এ একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুসহ অন্তত আটজন নিহত হন। একই দিনে গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় গুলিতে নিহত হয় ছয় বছর বয়সী আরেক শিশু। ৯ জুলাই কারেম আবু সালেম সীমান্ত দিয়ে সমন্বিত ত্রাণ পরিবহনের সময় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের চালক আহমদ নাসের সালিম নিহত হন।
১২ জুলাই নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের কাছে ইসরায়েলি গুলিতে নয় বছর বয়সী তালা জুমা আবু মাতার নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়। একই সময়ে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে একাধিক হামলার ঘটনাও ঘটে।
১০ জুলাই উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালের আঙিনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ তোলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, হাসপাতালটি ইসরায়েল ঘোষিত “গ্রিন জোন”-এর মধ্যেই ছিল। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলার অংশ।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান সংঘাতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩ হাজার ২৩১ জনে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৮৬ জন। সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির পর থেকে নিহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ১০৮ জন।
মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েল ও জাতিসংঘের তথ্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েলের ত্রাণ সমন্বয় সংস্থা কোগাট দাবি করেছে, গাজায় জাতিসংঘের চাহিদার চেয়েও বেশি পরিমাণে ত্রাণ প্রবেশ করেছে। তবে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (OCHA) জানিয়েছে, বিতরণ করা খাদ্য সহায়তা ন্যূনতম ক্যালরির মাত্র ৭৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারছে এবং জ্বালানি ও সরবরাহ সংকটে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
ওসিএইচএর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হয়েছে। এক সপ্তাহেই চিকেনপক্স, ত্বকের সংক্রমণ ও পরজীবীজনিত রোগের ১৮ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এদিকে ৯ জুলাই ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আগামী ২৮ নভেম্বর আইনসভা নির্বাচনের ঘোষণা দেন। প্রায় ২০ বছর পর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হলেও পূর্ব জেরুজালেমে ভোট আয়োজন, গাজার অবকাঠামো ধ্বংস এবং হালনাগাদ ভোটার তালিকার অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
পশ্চিম তীরে নতুন এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংস্থা পিস নাউ ও কেরেম নাভোত দাবি করেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সেখানে ১৮৫টি নতুন আউটপোস্ট, ১০২টি নতুন বসতি এবং ব্যাপক জমি দখলের মাধ্যমে কার্যত সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়েছে। একই সময়ে ১১৮টি ফিলিস্তিনি পশুপালক সম্প্রদায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
সপ্তাহজুড়ে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর, কৃষি স্থাপনা ও অবকাঠামো ভেঙে ফেলা হয়েছে। জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা, কৃষিজমির পানির লাইন কেটে দেওয়া এবং নতুন সামরিক সড়ক নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে।
বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও অব্যাহত রয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহে অন্তত ৩৫টি সহিংস ঘটনার রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে, যা ২৪০টির বেশি ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছে।
এদিকে সফররত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রো খান্না অভিযোগ করেছেন, পশ্চিম তীর সফরের সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তাঁকে ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে এক ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখে এবং পরে সেনাবাহিনীও তাদের চলাচলে বাধা দেয়। যদিও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
















