পৃথিবীর মহাসাগরের গভীর গোধূলি স্তরে প্রতি রাতেই শুরু হয় বিস্ময়কর এক প্রাকৃতিক ঘটনা। সূর্যের আলো মিলিয়ে যাওয়ার পর সমুদ্রের গভীর থেকে অগণিত ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্যের সন্ধানে ওপরে উঠে আসে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দৈনিক অভিবাসন শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যই নয়, পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ২০০ মিটার নিচ থেকে শুরু হওয়া এই গোধূলি স্তর প্রায় এক হাজার মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে সূর্যের আলো খুবই ক্ষীণ, আর আরও নিচে নেমে গেলে সম্পূর্ণ অন্ধকার। সেই অন্ধকারে অনেক প্রাণী নিজেদের জৈব আলোর মাধ্যমে টিকে থাকে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবীর মোট মাছের প্রায় ৯৫ শতাংশ জীবভর এই স্তরেই অবস্থান করে। প্রতি রাতে অসংখ্য ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী গভীর সমুদ্র থেকে ওপরে উঠে আসে এবং ভোর হওয়ার আগেই আবার নিচে ফিরে যায়। এ ঘটনাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিয়মিত প্রাণী অভিবাসন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গবেষকদের মতে, ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি উদ্ভিদজাত অণুজীব খেতে ওপরে আসে। দিনের আলো ফুটতেই বড় শিকারিদের আক্রমণ এড়াতে তারা আবার গভীর অন্ধকারে নেমে যায়। এভাবেই প্রতিদিন তাদের জীবনচক্র চলতে থাকে।
সমুদ্রবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রাণীগুলো সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বড় আকারের বহু মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী তাদের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এদের চলাচল সমুদ্রের বিভিন্ন স্তরের পুষ্টি উপাদান আদান-প্রদানেও সহায়তা করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই দৈনিক অভিবাসনের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কার্বন গভীর সমুদ্রে পৌঁছে যায়। ফলে সেই কার্বন দীর্ঘ সময়ের জন্য বায়ুমণ্ডল থেকে দূরে থাকে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি কিছুটা কমাতে সহায়তা করে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মাছ ধরার সম্ভাব্য সম্প্রসারণ এই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পর্যাপ্ত গবেষণা ছাড়া গভীর সমুদ্রের এই স্তরে বাণিজ্যিক আহরণ শুরু হলে সামুদ্রিক পরিবেশ এবং বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা চললেও সমুদ্রের এই গোধূলি স্তর এবং সেখানে বসবাসকারী প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা। তাই এই অনন্য সামুদ্রিক জগতকে আরও ভালোভাবে বোঝা এবং সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
















