বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হতে পারে
সংবিধান সংস্কারে চূড়ান্ত পদক্ষেপ: ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারির প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার
ঢাকা, ৯ নভেম্বর ২০২৫: দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে, অন্তর্বর্তী সরকার চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে “জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ–২০২৫” জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক তৈরি করা এই খসড়া আদেশ চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকারই আদেশে কী কী অন্তর্ভুক্ত থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত দেবে।
উপদেষ্টাদের দায়িত্ব ও সময়সীমা
- আদেশের প্রস্তুতি: সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আগামী বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে খসড়া আদেশটি উপস্থাপন করা হতে পারে।
- গণভোটের সিদ্ধান্ত: গণভোট কবে হবে বা আদৌ হবে কিনা, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
- দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টারা: আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান-কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
- সমঝোতার আহ্বান: গত সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠকে দলগুলোকে সাত দিনের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছিল, যার সময়সীমা আজ রোববার শেষ হচ্ছে। উপদেষ্টা ফাওজুল কবির নিশ্চিত করেছেন, “সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকলেও সমঝোতা না হলে সরকারই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।”
রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষীণ সম্ভাবনা
জুলাই সনদের সুপারিশ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে:
| দল/জোটের অবস্থান | মূল দাবি | বিতর্কের বিষয় |
| বিএনপি | ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট। নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) প্রজ্ঞাপনে থাকতে হবে। | তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিজেদের অনুকূলে সাজানো (জামায়াতের অভিযোগ)। |
| জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দল | জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট। গণভোটে কোনো নোট অব ডিসেন্ট থাকবে না। উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি বহাল রাখতে হবে। | নির্বাচনের দিন গণভোট হলে সংবিধান সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না। |
| আলোচনা: | বিএনপি জামায়াতসহ ৮ দলের আহ্বানে রাজি হয়নি। বিএনপি শুধু প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে আলোচনায় যেতে রাজি। |
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, বিএনপিকে আলোচনায় ডাকলেও তারা সাড়া দেয়নি। ফলে সরকার মনে করছে, সমঝোতা ছাড়াই আদেশ জারি করতে হবে।
গণভোট ও আদেশের আইনগত প্রেক্ষাপট
গণভোট নিয়ে আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে:
- আদেশ জারির ক্ষমতা: জামায়াত ও এনসিপি মনে করছে, আদেশ জারি করতে হবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে। সরকারি সূত্র অবশ্য বলছে, এটি আইনানুগভাবে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা হবে, কিন্তু ক্ষমতার ভিত্তি থাকবে গণঅভ্যুত্থান-গঠিত সরকারের ওপর।
- গণভোটের বিধান: ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া গণভোটের বিধানটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টের রায়ে পুনর্বহাল হয়। বিএনপি বলছে, সংবিধানে বিধানটি পুনঃসংযোজনের পরই গণভোট করা উচিত। অন্যদিকে জামায়াত প্রশ্ন তুলেছে, সংবিধানে বিধান না থাকলেও অতীতে কীভাবে গণভোট হয়েছিল।
নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে বিভাজন
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি ও সংসদের উচ্চকক্ষ (পিআর সিস্টেম) সহ ১৫টি প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) রয়েছে।
- জামায়াতের আশঙ্কা: জামায়াত ও এনসিপি মনে করছে, বিএনপি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো নিজেদের অনুকূলে সাজানোর উদ্দেশ্যে এই ভিন্নমত দিয়েছে। তাদের দাবি, গণভোটে নোট অব ডিসেন্ট রাখা যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা ধারণা করছেন, নির্বাচনের স্বার্থে বিএনপিও শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে। তবে জামায়াতসহ আট দল হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট না হলে তারা ঢাকায় জনসভা থেকে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে।
















