দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগ জোরদারে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতার ওপর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত ভারতের পূর্বমুখী কৌশলের নানা সীমাবদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ভারতের জন্য মিয়ানমার শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়; এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার একমাত্র স্থলপথ। ফলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভারতের আঞ্চলিক যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। সড়ক, মহাসড়ক, সীমান্ত বাণিজ্যকেন্দ্র এবং বহুমুখী পরিবহন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হলেও এর বাস্তবায়ন অনেকাংশে মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক প্রকল্পকে এই নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে ভারত থেকে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড পর্যন্ত পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মিয়ানমারের নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সশস্ত্র সংঘাতের কারণে প্রকল্পটি বারবার বিলম্বের মুখে পড়েছে।
একইভাবে কলকাতা থেকে মিজোরাম পর্যন্ত বিকল্প সমুদ্রপথ সংযোগ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া কালাদান বহুমুখী পরিবহন প্রকল্পও নিরাপত্তাজনিত কারণে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, আসাম ও ত্রিপুরার মতো রাজ্যগুলো এই সংযোগ প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ পাওয়ার আশা করেছিল। কিন্তু মিয়ানমারের চলমান অস্থিতিশীলতা সেই সম্ভাবনার গতি কমিয়ে দিয়েছে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ভারত ও মিয়ানমারের দীর্ঘ সীমান্ত অঞ্চল অতীতে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। দুই দেশের সহযোগিতা সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই সমন্বয়কে দুর্বল করতে পারে। এতে অস্ত্র চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
একই সঙ্গে মিয়ানমারকে ঘিরে ভারত ও চীনের কৌশলগত প্রতিযোগিতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। চীন ইতোমধ্যে অবকাঠামো, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক প্রকল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। ফলে ভারতও নিজের আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আগ্রহী।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই আঞ্চলিক সংযোগ সফল হবে না। নিরাপদ পরিবেশ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক করিডরগুলো তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না।
উত্তর-পূর্ব ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা এখন কৌশলগত প্রয়োজনীয়তায় পরিণত হয়েছে। তাই ভারতের পূর্বমুখী অগ্রযাত্রার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে প্রতিবেশী দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
















