বিশ্ব যেন এক শ্বাসরুদ্ধ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে — যদি হঠাৎ করেই জাতিসংঘের পতাকা নামিয়ে নেওয়া হয়, যদি এই প্রতিষ্ঠানের দরজা আগামী শুক্রবারের পর আর না খোলে, তবে মানবসভ্যতার কী হবে? আল জাজিরা এমনই এক প্রশ্ন তুলেছে — ‘যদি জাতিসংঘ বিলুপ্ত হয়?’ আর বিশ্লেষকরা উত্তর দিয়েছেন, পৃথিবী তখন কেমন দিশাহারা হয়ে পড়বে।
অষ্টাদশ শতাব্দীর পর থেকে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার যে বীজ বোনা হয়েছিল, জাতিসংঘ ছিল তার সর্বশেষ পূর্ণতা। গত আশি বছর ধরে এটি কেবল রাজনীতি নয়, মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, শান্তিরক্ষা, এমনকি স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও মানবতার প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ এই যাত্রায় সংগঠনটি নানা সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে— বিশেষত পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া, আফ্রিকা ও এশিয়ার কণ্ঠকে অবহেলা করা, এমনকি রুয়ান্ডা, বসনিয়া কিংবা দারফুরের হত্যাযজ্ঞ থামাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অনেকে মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের সময় জাতিসংঘ কার্যত নিস্তব্ধ ছিল। যুদ্ধবিরতি চেষ্টায় এর ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা এখন যেন মার্কিন নীতির ছায়ায় হারিয়ে গেছে।
তাহলে কি জাতিসংঘ আর দরকার নেই? ইতিহাস বলে, এর আগেও এমন একটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল— ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘লিগ অব নেশনস’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ টিকতে পারেনি। যদি জাতিসংঘও বিলুপ্ত হয়, তাহলে কী হবে?
অক্সফোর্ডের গবেষক জেফ ক্রিস্পের মতে, “যদি শুক্রবার জাতিসংঘ ভেঙে দেওয়া হয়, সোমবারই মানুষ নতুন করে সেটিকে গড়ার চেষ্টা শুরু করবে।” কারণ বর্তমান বিশ্বের সমস্যাগুলো সীমান্ত মানে না — শরণার্থী সংকট, দুর্ভিক্ষ, মহামারি — এগুলো মোকাবিলায় কোনো দেশ একা পারবে না। জাতিসংঘ না থাকলে লাখো উদ্বাস্তু আরও বিপন্ন হবে, কেউ ইউরোপে যাওয়ার পথ খুঁজবে, কেউ বন্দ camps-এ অনাহারে মরবে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জিওফ্রি নাইস বলেন, “জাতিসংঘ হারিয়ে গেলে আইনের পৃথিবীও অন্ধকারে ডুবে যাবে।” বড় দেশগুলো তখন নিজেদের স্বার্থেই আইন ব্যাখ্যা করবে। আইসিজে ও আইসিসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বেঁচে থাকলেও তাদের ক্ষমতা হবে নিঃস্ব। আইন থাকবে, কিন্তু প্রয়োগের হাত থাকবে না।
জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব রমেশ ঠাকুর বলেন, “জাতিসংঘ ছাড়া শান্তিরক্ষা মানে আসলে দখলদারিত্ব।” কারণ এককভাবে কোনো রাষ্ট্রের অভিযান কখনো নিরপেক্ষ হতে পারে না। জাতিসংঘের পতন মানে হবে বৈধতার পতন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্তন প্রধান বিজ্ঞানী ডা. সৌম্যা স্বামীনাথন সতর্ক করেছেন, “যদি শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বন্ধ হয়, শনিবারই মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়বে।” কারণ নিম্নআয়ের দেশগুলো ওষুধ বা টিকার নিরাপত্তা যাচাই করতে নিজেরাই সক্ষম নয়। ফলে মৃত্যুহার হঠাৎ বেড়ে যাবে।
সহায়তা বা উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক জেমস থমাস। তার মতে, “জাতিসংঘ, ডব্লিউএইচও বা ইউএসএইড — এই সংস্থাগুলো ছাড়া বিশ্ব সাহায্যব্যবস্থা ধসে পড়বে।” স্থানীয় ছোট সংগঠনগুলো হয়তো এগিয়ে আসবে, কিন্তু তাদের পক্ষে বৈশ্বিক সঙ্কট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না।
কূটনীতিতেও বিশৃঙ্খলা ছড়াবে বলে মনে করেন বিশ্লেষক এইচএ হেলিয়ার। “জাতিসংঘ হারিয়ে গেলে কূটনীতি হয়ে যাবে কেবল লেনদেনভিত্তিক। বড় দেশগুলো ছোটদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে, আর আন্তর্জাতিক আইন তখন হবে নিছক মুখোশ।”
পরিবেশবিজ্ঞানী চুকওমেরিজে ওকেরেকে বলেন, “জাতিসংঘই একমাত্র মঞ্চ, যেখানে পৃথিবী এক কণ্ঠে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কথা বলে।” যদি এটি ভেঙে যায়, ধনী দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে জলবায়ু তহবিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, গরিব দেশগুলো পড়বে অচলায়তনে।
শেষ কথা হিসেবে আন্তর্জাতিক সংকট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক রিচার্ড বার্গন বলেন, “জাতিসংঘ শুধু নিরাপত্তা পরিষদ নয়, এটি আমাদের বিশ্বের নেপথ্য সংযোগ— যেন বহুজাতিকতার ওয়াইফাই। সেটি বন্ধ হয়ে গেলে পুরো পৃথিবীর যোগাযোগই থেমে যাবে।”
জাতিসংঘের পতাকা যদি সত্যিই একদিন নামিয়ে নেওয়া হয়, তবে পৃথিবীর আকাশে ঝুলে থাকবে এক অনন্ত প্রশ্ন— মানবতার পতাকা তখন কে তুলবে?















