দেশীয় বিনোদনে কনটেন্ট প্রচারের ক্ষেত্রে এখন ওটিটির প্রাধান্য বেশি। টিভি সেটের সামনে নির্দিষ্ট সময় নিয়ে বসে থাকার চেয়ে নিজের পছন্দমতো সময়ে স্মার্টফোনে নিজের পছন্দের কনটেন্ট দেখে নিতেই দর্শকরা এখন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যদিও পাঠকরা জানেন, তবু আরও একবার বলে নেওয়া যাক ওটিটি কী এবং কেন এটি জনপ্রিয় হচ্ছে? ওটিটি হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস, যেখানে টেলিভিশন বা ক্যাবলে যুক্ত হওয়া ছাড়াই দর্শক ভিডিও দেখে, সেটি মোবাইল, ট্যাব বা স্মার্ট টিভিতে। এ প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিজ্ঞাপনের তুলনায় কম বাধা, বিভিন্ন ধাঁচের কনটেন্ট, ও প্রয়োজন অনুযায়ী দেখার সুবিধা থাকার কারণে দর্শক তা দ্রুত গ্রহণ করছে। বাংলাদেশে জনপ্রিয় কিছু ওটিটি হলো চর্কি, বিঞ্জ, হইচই, টফি ইত্যাদি, যেখানে নাটক, ওয়েব সিরিজ, শর্ট ফিল্ম ও সিনেমা একসঙ্গে পাওয়া যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৮.৫ শতাংশ মানুষ ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে টেলিভিশনের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয়, বিশেষ করে বিজ্ঞাপন কম, কন্টেন্টের ভিন্নতা বেশি, এ কারণে।
টিভি নাটক বনাম ওটিটি নাটক এ বিতর্কটি এসেছে মূলত দর্শকের পছন্দে বদল হওয়ার কারণে। বাংলাদেশে টিভি নাটকের ঐতিহ্য বহু পুরোনো-গান, আবেগ, সামাজিক গল্প, পারিবারিক সম্পর্কের নাটকগুলো দর্শকদের সঙ্গে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু ওটিটি নাটকগুলোতে গল্প বলার পদ্ধতি, থিম, চরিত্র নির্মাণ এবং প্রেজেন্টেশনে পার্থক্য এসেছে। টিভি নাটক সাধারণত কনজারভেটিভ থিম, পরিবার-সম্পর্ক, নৈতিকতাভিত্তিক গল্প দেখায়। অন্যদিকে ওটিটি নাটক গল্পে বেশি বৈচিত্র্য, জটিল চরিত্র, সামাজিক ইস্যু, থ্রিলার, রহস্য বা এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক থিমগুলোকে তুলতে পারে, যা টিভি সীমাবদ্ধতায় সম্ভব ছিল না।
এটি দর্শকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা দিলেও, কিছু পুরোনো দর্শক মনে করেন, ওটিটি নাটকগুলো অনেক সময় বেশি ‘রিস্ক’ হয়ে পড়ে, যেখানে গল্পের মূল দর্শক চাহিদা বা নৈতিক দিক কম গুরুত্ব পায়। এটা একটি চলমান আলোচনার বিষয়। এটাও ঠিক যে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নাট্য নির্মাতা, লেখক ও অভিনেতাদের জন্য নতুন পথ খুলেছে। আগে টিভি নাটকের সময়সূচি, বিজ্ঞাপন বিরতি, নিয়ন্ত্রিত বাজেট ইত্যাদি অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু ওটিটির ফলে এখন নির্মাতারা অনেক বড় বাজেটের কাজ করতে পারনে, গল্প বলার ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতাও বেশি এবং দর্শকরা চাইলে একসঙ্গে সিরিজের সব এপিসোড দেখতে পারেন। এ কারণে অনেক তরুণ নির্মাতা ও লেখক ওটিটি নাটকে ঝুঁকছেন। এমনকি কিছু ওটিটি সিরিজ যেমন ‘মহানগর’, ‘কারাগার’, ‘তাকদীর’ ইত্যাদি জনপ্রিয়তা পেয়ে টিভির বাইরে নিজেদের আলাদা পরিচিতি গড়েছে। (অনেক দর্শকের মতামত অনুযায়ী)
যদিও দেশে ওটিটি নাটকের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, কিছু বড় চ্যালেঞ্জও দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-
১. সাবস্ক্রিপশন খরচ : অনেক দর্শক মনে করেন ওটিটি সাবস্ক্রিপশন দাম বাংলাদেশে তুলনামূলক বেশি, এটা অনেকের কাছে বাধা।
২. প্রযুক্তিগত সমস্যা : কন্টেন্ট খুঁজে পাওয়া, নেটওয়ার্ক ল্যাগ, অ্যাপ ইন্টারফেস ইত্যাদি প্রযুক্তিগত অসুবিধা কিছু ব্যবহারকারীর জন্য হতাশাজনক।
৩. পাইরেসি : ওটিটি নাটক দ্রুত অনলাইন পাইরেটেড সাইট বা ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দর্শক প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনে যেতে অনিচ্ছুক থাকে। (বাংলাদেশের অনলাইন কমিউনিটিতে এমন মন্তব্য পাওয়া যায়)
৪. কন্টেন্ট মান : কিছু সমালোচক মনে করেন, যেহেতু ওটিটিতে প্রবেশ বাধা কম, অনেক সময় গুণগত মানের নাটকগুলোও ভিড়ে হারিয়ে যায় বা কম বাজেটের কাজ বেশি দেখা যায়, এটা শিল্পের মানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। (এ ধরনের মতামত আন্তর্জাতিক আলোচনায়ও পাওয়া যায়)।
প্রশ্ন হচ্ছে, ওটিটির প্রাধান্যের কারণে টিভি নাটকের ভবিষ্যৎ কী মুছে যাবে? কিংবা ওটিটি কি টিভি নাটককে সম্পূর্ণভাবে বদলে দেবে? উত্তরটি সরল নয়। দেখা যাচ্ছে, অনেক দর্শক এখনো পরিবারের সঙ্গে টিভি নাটক দেখাকে পছন্দ করেন, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে। এতে বলা যায়, টিভি নাটকের দর্শক এখনো রয়েছে। সঙ্গে এটাও সত্যি, ওটিটি নাটক দর্শকদের একটি নতুন বিভাগ তৈরি করেছে, বিশেষ করে যুব সমাজে, যারা বিভিন্ন থিম, নতুন গল্প ও স্বাধীন ধারার নাটক দেখতে চায়। অন্যদিকে টিভি নির্মাতারা ওটিটি দিকে ঝুঁকছেন, কারণ এখানে গল্প বলার স্বাধীনতা ও বাজেটের সুযোগ বেশি। সুতরাং, টিভি নাটক মুছে যাবে না, বরং একটি দ্বিমাধ্যমিক পরিস্থিতি তৈরি হবে, টিভি নাটক থাকবে পরিবারভিত্তিক দর্শকের জন্য, আর ওটিটি নাটক থাকবে নতুন ও বৈচিত্র্যময় দর্শকদের জন্য।
অন্যদিকে, ওটিটি প্লাটফর্মগুলো বাংলাদেশি নাটককে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বাংলা ভাষাভাষী দর্শক বাংলাদেশি নাটক ও সিরিজ দেখেন, ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি কনটেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এমনকি কিছু আন্তর্জাতিক সিরিজ ও সিনেমাও বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, এবং বাংলাদেশি নির্মাতারা এ থেকে অনুপ্রেরণা পাচ্ছে।
পরিশেষে এটা বলা যায়, ওটিটি যুগে বাংলাদেশের টিভি নাটক মৃতপ্রায় নয়, বরং একটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নাটকের গল্প বলার ধরন, দর্শকের অভ্যাস, শিল্পীর সুযোগ-সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা-সব কিছু বদলে দিচ্ছে। এ পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ, কিন্তু এতে বাংলাদেশের নাট্যশিল্প বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে।
















