যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন পারমাণবিক চুক্তির কথা বললেও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়—ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে কি না। কারণ এই প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করে একটি দেশ কতটা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে।
ইরান দাবি করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য। তবে অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে অনেক বেশি মাত্রায় সমৃদ্ধ করতে হয়, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে।
ইউরেনিয়াম একটি ভারী ধাতু, যা প্রাকৃতিকভাবে মাটি ও পাথরে অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়। এটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অস্ত্র উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। কাজাখস্তান, কানাডা, নামিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও উজবেকিস্তান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম উৎপাদন করে।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের বেশিরভাগ অংশ ইউ-২৩৮ নামে পরিচিত, যা খুব বেশি সক্রিয় নয়। কিন্তু ইউ-২৩৫ নামের অংশটি তুলনামূলকভাবে সক্রিয় এবং এটিই পারমাণবিক বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন। সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে ইউ-২৩৫ আলাদা করে তার পরিমাণ বাড়ানো হয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এরপর তা দ্রুত ঘূর্ণায়মান যন্ত্রে ঘুরিয়ে হালকা অংশকে আলাদা করা হয়। একাধিক ধাপে এই কাজ করে ধীরে ধীরে ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব বাড়ানো হয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সাধারণত ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই যথেষ্ট। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধকরণ প্রয়োজন হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থা International Atomic Energy Agency অনুযায়ী, ২০ শতাংশের নিচে নিম্নমাত্রার এবং তার ওপরে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হিসেবে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমৃদ্ধকরণের শুরুটা সবচেয়ে কঠিন। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু একবার ৬০ শতাংশে পৌঁছে গেলে ৯০ শতাংশে যেতে সময় অনেক কম লাগে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করতে কয়েক সপ্তাহ সময়ই যথেষ্ট হতে পারে, যেখানে শুরু থেকে একই পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক বছর লাগে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক টেড পোস্টল বলেছেন, ইরানের বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী ৬০ শতাংশ থেকে অস্ত্রমানের পর্যায়ে পৌঁছাতে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
তবে শুধু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকলেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব নয়। সেটিকে ধাতুতে রূপান্তর, বিস্ফোরণ ব্যবস্থা তৈরি এবং ক্ষেপণাস্ত্রে বহনের সক্ষমতাও প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের কাছে এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অনেকটাই ইতোমধ্যে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি অনুযায়ী, বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বৈধ, তবে তা অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যাবে না। ইরান এই চুক্তির সদস্য হলেও তাদের কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্ব শক্তিগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে সমৃদ্ধকরণের মাত্রা সীমিত রাখার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় এবং ইরান ধীরে ধীরে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
বর্তমান আলোচনায় ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে তারা চাইলে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কমিয়ে আনতে পারে। তবে পুরোপুরি সমৃদ্ধকরণ বন্ধের বিষয়ে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হাতে থাকা এই পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কত দ্রুত তারা অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারে, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
















