অর্ধশতাব্দীর দীর্ঘ যাত্রা শেষে শেষ হতে চলেছে জাপানের কিংবদন্তি সুপারহিরো সিরিজ সুপার সেনটাই — যে গল্প একসময় পৃথিবীজুড়ে শিশুদের কল্পনার আকাশে রঙ ছড়িয়েছিল, আর জন্ম দিয়েছিল মার্কিন টেলিভিশনের বিখ্যাত পাওয়ার রেঞ্জার্স সিরিজকে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পঞ্চাশ বছর পর অবশেষে বন্ধ হতে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানটি।
১৯৭৫ সালে টিভি আসাহিতে প্রচার শুরু হওয়া সুপার সেনটাই পাঁচ তরুণ-তরুণীর রঙিন পোশাক পরা যোদ্ধায় রূপান্তরের কাহিনি, যারা মহাকাশ থেকে আগত দানবদের বিরুদ্ধে লড়ে মানবজাতিকে রক্ষা করে। এই গল্পই পরে পাওয়ার রেঞ্জার্স–এর মূল অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে, যা ১৯৯০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ এশিয়ার নানা দেশে শিশুমন জয় করেছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলনা, পোশাক, অনুষ্ঠান ও সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর বিক্রি থেকে পাওয়া আয় প্রযোজনার ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে দীর্ঘ পাঁচ দশকের এই যাত্রা এখন এসে দাঁড়িয়েছে সমাপ্তির দোরগোড়ায়। টিভি আসাহি এখনো ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
সিরিজটি শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নয়, বরং জাপানের শিশু সংস্কৃতির এক যুগের প্রতীক ছিল। প্রতি সপ্তাহে সম্প্রচারিত এই অনুষ্ঠান ছিল এক অর্থে এক বিশাল বিজ্ঞাপন—খেলনা, পোশাক ও হিরোদের রঙিন জগৎকে বাস্তবে ছুঁয়ে দেখার আহ্বান।
জাপানের বাইরেও সুপার সেনটাই ছিল এক জাদুর দরজা, যা বিদেশি দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল জাপানের টোকুসাতসু বা লাইভ-অ্যাকশন হিরো সংস্কৃতির সঙ্গে। ফিলিপাইনে চৌদেনশি বায়োম্যান ও হিকারি সেনটাই মাস্কম্যান–এর মতো সিরিজ ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ঠিক একইভাবে।
প্রতিটি পর্বের কাঠামো ছিল এক—রোমাঞ্চকর মার্শাল আর্ট লড়াই দিয়ে শুরু, তলোয়ারের সংঘর্ষে উত্তেজনা আর শেষে বিশাল রোবট ও দানবের যুদ্ধে পরিণতি। সেই জীবন্ত অভিনয়, সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেও আবেগময় উপস্থাপন, ৮০ ও ৯০–এর দশকের দর্শকদের মুগ্ধ করে তুলেছিল।
১৯৯৩ সালে শুরু হওয়া পাওয়ার রেঞ্জার্স সিরিজ পরে বহু সিজন ও স্পিন–অফের জন্ম দেয়, যা আজও ইউটিউবে দেখা যায়। প্রযোজক হেইম সাবান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “শুরুতে এই ধারণা বিক্রি করা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। সবাই আমাকে পাগল ভাবত।”
সিরিজটির অবসানের খবর প্রকাশের পর ভক্ত ও অভিনেতাদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর আবেগ। জনপ্রিয় অভিনেত্রী কেইকো কিতাগাওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “এ যেন এক হতাশার মুহূর্ত।” তার সেই পোস্ট মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে লক্ষ মানুষের মনে। অভিনেতা ইয়াসুহিসা ফুরুহারা, যিনি একসময় এই সিরিজে অভিনয় করেছিলেন, গর্বের সঙ্গে লিখেছেন, “আমি ইতিহাসের অংশ হতে পেরেছি, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
একজন ভক্ত সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমার বাবা-মা ছোটবেলায় দেখতেন সুপার সেনটাই। এখন আমিও দেখি। মনে হচ্ছে, শৈশবের এক টুকরো হারিয়ে যাচ্ছে।” আরেকজন প্রশ্ন করেছেন, “সুপার সেনটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে, এখন ছেলেরা কী দেখবে?”
পঞ্চাশ বছরের আলো, রঙ, আর কল্পনার এই কিংবদন্তি সিরিজের বিদায় যেন জাপানের সাংস্কৃতিক আকাশে এক গভীর নস্টালজিয়ার সূর্যাস্ত।















