ইউরোপ যেন এক অনিশ্চিত ভোরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে—যেখানে বাতাসে ভাসছে যুদ্ধের গন্ধ। রাশিয়া যখন নীরবে ন্যাটোর বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন ইউরোপের প্রতিক্রিয়া যেন এক বিক্ষিপ্ত স্বর, সমন্বয়ের অভাবে ক্লান্ত ও দিশাহারা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাল্টিক ও উত্তর সাগরে রাশিয়ার নতুন সামরিক ও গোয়েন্দা তৎপরতার মুখে ইউরোপ এখনো প্রস্তুত নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব, যা মহাদেশকে করে তুলছে আরও অসহায়।
গত সপ্তাহের ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্মেলন যেন সেই ভাঙনের প্রতীক। বেলজিয়াম বাধা দেয় রুশ সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা জোরদারের প্রস্তাবে। এমনকি রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’—যা গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতার অভিযোগে অভিযুক্ত—তার কথাও ওঠেনি চূড়ান্ত আলোচনায়।
“আজকের ইউরোপ রাশিয়ার মুখোমুখি হতে যতটা অপ্রস্তুত, ১৯৩৯ সালে নাৎসি বাহিনীর আগমুহূর্তেও ছিল ততটাই,” বলেন জোসেফ ফিৎসানাকিস, যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টাল ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। তাঁর মতে, “ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড বা বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো বিপদের আভাস পেয়েছে, কিন্তু পশ্চিম ইউরোপের জনমত এখনো ঘুমিয়ে আছে—রুশ প্রচারণার জালে আটকে।”
রাশিয়ার তথাকথিত ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ এখন শুধু অস্ত্র নয়, মানসিক চাপের এক শিল্পে পরিণত হয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের উত্তর ইউরোপ পরিচালক আনা ভিসল্যান্ডার বলেন, “এই কৌশল আমাদের ক্লান্ত করে তুলছে, বিভ্রান্ত করছে, যেন শেষ পর্যন্ত আমরা নিজেদের বিভক্ত অবস্থাকে মেনে নিই—যা রাশিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য।”
এমনই এক উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে, সেপ্টেম্বরে একের পর এক ঘটনা ইউরোপের আকাশে ছড়িয়ে দেয় আতঙ্ক। ১০ সেপ্টেম্বর রুশ ড্রোন ন্যাটোর আকাশসীমায় প্রবেশ করে পোল্যান্ডের প্রতিরক্ষা পরীক্ষা করে। তারপর রুশ মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান প্রবেশ করে এস্তোনিয়ার আকাশে, জার্মানি ও লিথুয়ানিয়ার দিকেও পাঠানো হয় ন্যাটোর ফাইটার জেট।
ফিৎসানাকিস বলেন, রাশিয়ার সামরিক নথিতে এ সময়টিকে বলা হয় ‘স্পেশাল পিরিয়ড’—যুদ্ধের আগমুহূর্তে উত্তেজনার সময়কাল।
জার্মানির গোয়েন্দা প্রধান মার্টিন জেগার সম্প্রতি সতর্ক করেছেন, “আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না যে রাশিয়ার হামলা ২০২৯-এর আগে আসবে না। ইউরোপ এখন এক নতুন সংঘাতের গুণগত বাস্তবতায় প্রবেশ করছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক স্পেশাল ফোর্স কমান্ডার দিমিত্রিস গ্রিমস এই সময়কে বলেন “ফেজ জিরো”—অর্থাৎ প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, এবং বেসামরিক-সামরিক সীমারেখা মুছে ফেলার পর্যায়।
ফিৎসানাকিসের ভাষায়, “রুশ গোয়েন্দা সংস্থা যেমন সক্রিয়, রুশ সেনাবাহিনিও এখন ন্যাটোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
এদিকে মস্কো সব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউরোপকেই অভিযুক্ত করেছে অযথা আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রদিয়ন মিরোশনিক তাস সংবাদ সংস্থাকে বলেন, “ইউরোপ দুর্ভাগ্যবশত যুদ্ধমুখী মনোভাব নিয়েছে। তারা রাশিয়া-ইউক্রেন বা রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সংলাপ ঠেকাতে চাইছে।”
কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার প্রস্তুতি এখন সর্বব্যাপী। শ্যাডো ফ্লিট নামে পরিচিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো শুধু নিষেধাজ্ঞা এড়াতেই নয়, ন্যাটোর যোগাযোগে গুপ্তচরবৃত্তি ও ড্রোন হামলার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সন্দেহ।
ফ্রান্সের কমান্ডোরা ২ অক্টোবর ‘বোরাকাই’ নামের একটি রুশ জাহাজ আটক করে, যা ডেনমার্কের উপকূলে ড্রোন হামলার সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে নরওয়ের চীনা প্রযুক্তি-নির্ভর ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায়—যার পেছনে রাশিয়া-চীন সহযোগিতার ছায়া দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়া এখনও টুকরো টুকরো। কিছু দেশ ড্রোন প্রতিরক্ষা বা ট্যাংকার তল্লাশি শুরু করলেও, কোনো সমন্বিত ইউরোপীয় নীতি গঠিত হয়নি।
ভিসল্যান্ডার বলেন, “নর্ডিক ও বাল্টিক দেশগুলো চাইলে যৌথ অভিযান চালিয়ে রাশিয়ার এই ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধে বড় আঘাত হানতে পারত। কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে সুযোগ হারানো হচ্ছে।”
গ্রিমসের মতে, এখনই প্রয়োজন ইইউ পর্যায়ে সমুদ্রবাণিজ্য তদারকি, আকাশ পর্যবেক্ষণ জোরদার, উন্নত ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ঐক্যবদ্ধ নিষেধাজ্ঞা।
কিন্তু ইউরোপের আরেক সমস্যা—তার পুরনো ভরসা, যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার স্যাটেলাইট নজরদারি ও গোয়েন্দা সহায়তার উপর নির্ভর করেছে ইউরোপ। কিন্তু এখন সেই আস্থা ভেঙে পড়ছে।
ফিৎসানাকিস বলেন, “আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের রাজনৈতিক লড়াইয়ে বন্দি হয়ে পড়েছে। তারা রুশ হুমকিকে আর অগ্রাধিকার দিচ্ছে না।”
নেদারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করেছে। ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, এখন কেউই নিশ্চিত নয়—যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোন পক্ষের পাশে।
গ্রিনল্যান্ড ও কানাডাকে ঘিরে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক বক্তব্য ইউরোপের মিত্রদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে।
ফিৎসানাকিস বলেন, “রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য—কারণ এটি ন্যাটোকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করেছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মাঝেও ফাটল সৃষ্টি করেছে।”
এক বিভক্ত ইউরোপ, এক দ্বিধাগ্রস্ত আমেরিকা, আর এক আত্মবিশ্বাসী রাশিয়া—এই তিন ছায়ার মাঝে আজ ইউরোপের নিরাপত্তা যেন ঝুলে আছে অনিশ্চিত আকাশে।















