অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ইরান সরকার দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ঋণদাতা আয়ান্দেহ ব্যাংককে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক মেল্লির সঙ্গে একীভূত করেছে। বৃহস্পতিবার ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ধনী ব্যবসায়ী আলি আনসারির পরিবারের মালিকানাধীন আয়ান্দেহ ব্যাংক বিলুপ্ত হয়ে রোববারের মধ্যেই এর সব শাখা ব্যাংক মেল্লির শাখায় পরিণত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছে যে তাদের আমানত ও চুক্তিগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। তবে ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম ও বিশাল ঋণের বোঝা দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকদের কাঁধেই পড়বে।
আয়ান্দেহ ব্যাংকের উৎপত্তি ২০১০-এর দশকে, যখন দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে ইরানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা চরম সংকটে পড়ে। তখন শত শত অবৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, যেগুলো অত্যধিক সুদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ করলেও পরবর্তীতে অনেকেই আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়।
২০১৭ সালের মধ্যে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়, কিন্তু এর আগেই তারা বিশাল পরিমাণে ভেতরের লোকদের ঋণ দিয়ে অর্থ ফুরিয়ে ফেলে। ফলে বিপুল পরিমাণ টাকা পুনরুদ্ধারে নতুন টাকা ছাপাতে হয়, যা মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
২০১৩ সালে ট্যাট ব্যাংক, সালেহিন ও আতি নামের দুটি রাষ্ট্র-সংযুক্ত ক্রেডিট প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণের মাধ্যমে আয়ান্দেহ ব্যাংকের যাত্রা শুরু হয়। ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা আনসারি ইরানের অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী, যিনি রিয়েল এস্টেট, টেলিকম, ইস্পাত ও হোটেল খাতে বিশাল বিনিয়োগ করেছেন।
দুই বছর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আয়ান্দেহর শেয়ারহোল্ডারদের ৬০ শতাংশ ভোটাধিকার বাতিল করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে দেয়। কিন্তু তাতেও ব্যাংকের ক্ষতি থামেনি; বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ধার নিয়ে টিকে ছিল প্রতিষ্ঠানটি।
গত সপ্তাহে বিলুপ্তির সময় আয়ান্দেহ ব্যাংকের মোট ঋণ ছিল প্রায় ৫ কোয়াড্রিলিয়ন রিয়াল (৪.৬৭ বিলিয়ন ডলার) এবং আমানত ছিল ২.৫ কোয়াড্রিলিয়ন রিয়াল (২.৩৪ বিলিয়ন ডলার)। ব্যাংকটি আইনি সীমার ১০ গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে, যার মধ্যে ১.৩ কোয়াড্রিলিয়ন রিয়াল (১.২১ বিলিয়ন ডলার) গেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সংযোগ ও প্রকল্পে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, আয়ান্দেহ একাই ইরানের ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া মোট ওভারড্রাফটের ৪২ শতাংশ এবং মূলধন ঘাটতির ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী। ব্যাংকটির মূলধন যথাযথতার অনুপাত (CAR) ছিল ঋণাত্মক ৬০০ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী তা ন্যূনতম ৮ শতাংশ থাকা উচিত।
আয়ান্দেহর বিলুপ্তিতে পুরো ব্যাংক খাতের গড় মূলধন অনুপাত ১.৩৬ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে এটি কেবল ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকটের একটি উদাহরণ।
এর আগেও ২০২০ সালে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক সেপাহের সঙ্গে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, অন্তত পাঁচটি ব্যাংক এখনো মারাত্মক ভারসাম্যহীন অবস্থায় রয়েছে।
বুধবার বিচার বিভাগের প্রধান গুলামহোসেন মোহসেনি-এজেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ রেজা ফারজিনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আপনার হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে; আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন, না হলে আমরা হস্তক্ষেপ করব।”
তবে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রেপ্তার বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কঠোরপন্থী রাজনীতিকরা এই ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দুর্নীতির উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেখানে রক্ষণশীলরা এটিকে “দেশের শাসনব্যবস্থার সাফল্য” বলে অভিহিত করেছেন।
আয়ান্দেহর সম্পদ, যার মধ্যে পশ্চিম তেহরানে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় শপিং সেন্টার ইরান মলও রয়েছে, এখন রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে। তবে এই সম্পদ বিক্রি করা সময়সাপেক্ষ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, আয়ান্দেহর শীর্ষ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতির কিছুটা দায় নিতে হবে, তবে কতটা এবং কবে তা পরিষ্কার নয়। গণমাধ্যমের অনুমান অনুযায়ী, সরকার ও ব্যাংক মেল্লিকে মোট ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বহন করতে হবে।
এর একটি অংশ নতুন টাকা ছাপিয়ে পরিশোধ করা হবে, যা ইতিমধ্যেই ৪০ শতাংশেরও বেশি মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে সাধারণ ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বেড়েছে, বিশেষ করে মুরগি, ডিম, মাংস ও ডালের দাম হু-হু করে উঠেছে।
অন্যদিকে, আয়ান্দেহ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা আলি আনসারি দাবি করেছেন, ব্যাংকের পতন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল। তিনি বলেন, “আমার বিবেক শান্ত, আমি দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।”
















