পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার জেরে যৌথ সামরিক অভিযান, পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান
তেহরানসহ একাধিক শহরে বিস্ফোরণ, আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে বড় আকারের চলমান সামরিক কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কয়েক দফা হুমকি, উত্তেজনা এবং পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই এই হামলা শুরু হয়।
তেহরানে একাধিক বিস্ফোরণের খবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে। পরে নিশ্চিত করা হয়, ইসরায়েল প্রথমে ইরানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই অভিযানে অংশ নেয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছিল ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন এপিক ফিউরি। ট্রাম্প বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনী অকার্যকর করা এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত করাই এই অভিযানের উদ্দেশ্য। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান যেন কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে ইরানের সেনাদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে সতর্কবার্তাও দেন তিনি।
ইরানের বিভিন্ন স্থানে হামলার খবর পাওয়া গেছে। তেহরানের ইউনিভার্সিটি স্ট্রিট ও জোমহুরি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানানো হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের সদর দপ্তরের কাছাকাছি বিস্ফোরণের কথাও বলা হয়েছে। রাজধানীর উত্তরাঞ্চল সাইয়্যেদ খানদান এলাকাতেও বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া কেরমানশাহ, কোম, তাবরিজ, ইসফাহান, ইলাম, কারাজ ও লোরেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণের খবর এসেছে।
এই হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন তাদের জন্য হুমকি। ইরান বরাবরই বলে আসছে, তারা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে চায় না। তবে ইসরায়েল নিজেই মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুরু হয় জেনেভায় আলোচনায় অগ্রগতির ঘোষণা আসার পর। সেখানে ইরান শূন্য ইউরেনিয়াম মজুদ ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পূর্ণ যাচাই মেনে নিতে রাজি হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। তবুও হঠাৎ সামরিক অভিযানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
হামলার পরপরই ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে আঘাত হানে। দেশটির বিভিন্ন স্থানে সতর্ক সাইরেন বেজে ওঠে। একই সঙ্গে কাতারের আল উদেইদ ঘাঁটি, কুয়েতের আল সালেম ঘাঁটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা ঘাঁটি এবং বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে জানানো হয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ ও জর্ডানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ইসরায়েলের অভিযানের নাম রাখা হয়েছে লায়নস রোর।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজধানীতে তাঁর বাসভবনের আশপাশের সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান অক্ষত আছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ওমান বলেছে, তাদের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনা নতুন করে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কাতার নিজেদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্স সংঘাতকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছে। রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, ইরানকে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। কানাডাও একই অবস্থান জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং ইরানের পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় আকারের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
















