জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট মাইকেল ডি হিগিনসের মেয়াদ শেষে আয়ারল্যান্ডে শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের উত্তাপ। তিন প্রার্থীর দৌড়ে একজন সরে দাঁড়ানোর পর নির্বাচন এখন আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগামী শুক্রবার দেশজুড়ে ভোট হবে, যার মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন সাত বছরের জন্য নতুন প্রেসিডেন্ট।
যদিও আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক, তবে এবার ভোট হচ্ছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেশটি এখন ডান-বাম বিভাজনের রাজনীতির দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ডাবলিনের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ইউরোপিয়ান অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা পরিচালক ব্যারি কোলফার আল জাজিরাকে বলেন, “এই প্রথমবার আয়ারল্যান্ডে স্পষ্টভাবে বামপন্থী ও ডানপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে।”
রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের সূত্রপাত ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে, যেখানে বামপন্থী জাতীয়তাবাদী দল সিন ফেইন প্রথমবারের মতো সর্বাধিক ভোট পায়। এরপর দীর্ঘদিনের দুই প্রধান কেন্দ্র-ডান দল ফিয়ানা ফেল ও ফাইন গেল মিলিতভাবে গ্রিন পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করে।
প্রেসিডেন্ট মাইকেল ডি হিগিনস ২০১১ সাল থেকে দায়িত্বে আছেন। তিনি রাষ্ট্রপতির প্রথাগত সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও মত দিয়েছেন, বিশেষ করে গৃহসংকট ও সামরিক নিরপেক্ষতা ইস্যুতে। ফিলিস্তিনের পক্ষে তার অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছে।
আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সীমিত হলেও মর্যাদাপূর্ণ। তারা দেশের সংবিধান রক্ষায় দায়িত্বশীল এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাগত জানান। ইতিহাসে মেরি রবিনসন (১৯৯০-১৯৯৭) ছিলেন প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট, যিনি এই পদটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমান নির্বাচনে তিনজন প্রার্থী রয়েছেন—স্বতন্ত্র প্রার্থী ক্যাথরিন কনলি, ফাইন গেলের হিদার হামফ্রিস এবং ফিয়ানা ফেলের জিম গ্যাভিন। তবে গ্যাভিন দুর্নীতির অভিযোগে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন, যদিও ভোটের ব্যালটে তার নাম রয়ে গেছে।
ক্যাথরিন কনলি (৬৮) একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য, যিনি সিন ফেইন, গ্রিন পার্টি ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন পেয়েছেন। আইনজীবী ও মনোবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করা কনলি দীর্ঘদিন ধরেই সমাজ ও মানবাধিকার ইস্যুতে সক্রিয়। তিনি গৃহসংকট, দারিদ্র্য, প্রতিবন্ধী অধিকার ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব রয়েছেন। কনলি বলেছেন, “ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে—আমি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ফিলিস্তিনি জনগণের পাশে থাকব।” জরিপে তিনি ৩৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে আছেন।
হিদার হামফ্রিস (৬২) ফাইন গেলের প্রার্থী, যিনি একাধিক মন্ত্রিপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। উত্তর আয়ারল্যান্ড সীমান্তবর্তী কেভান-মোনাহান এলাকার প্রতিনিধি হামফ্রিস নিজেকে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে দ্বীপজুড়ে ঐক্য ও পুনর্মিলনের বার্তা দিতে চান। তার সমর্থন বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ।
অন্যদিকে জিম গ্যাভিন (৫৪), ফিয়ানা ফেল প্রার্থী, সাবেক গেইলিক ফুটবল কোচ এবং সামরিক কর্মকর্তা। তিনি নির্বাচনী বিতর্কের পর পরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। তবুও তার ভোট গণনা হবে এবং প্রয়োজন হলে নতুন নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।
নির্বাচন পদ্ধতিতে ভোটাররা তাদের পছন্দের ক্রমানুসারে প্রার্থীদের নাম লেখেন—যদি প্রথম পছন্দের কেউ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পান, তবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পছন্দের ভোট যুক্ত হয়। ফল ঘোষণা হবে ২৫ অক্টোবর, এবং নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নেবেন ডাবলিন ক্যাসেলে।
এবারের নির্বাচনে মূল ইস্যু তিনটি—গৃহসংকট, সামরিক নিরপেক্ষতা ও আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলন। আবাসন সংকটে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রবল, যা কনলির পক্ষে যাচ্ছে। একইভাবে তিনি দৃঢ়ভাবে নিরপেক্ষ নীতির পক্ষে, যেখানে হামফ্রিস চান ট্রিপল লক আইনের সংস্কার—যাতে জাতিসংঘের অনুমতি ছাড়া আয়ারল্যান্ড সীমিত পরিসরে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিতে পারে।
ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনর্মিলনের প্রশ্নেও উভয় প্রার্থী ইতিবাচক। কনলি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টিকে দেখছেন, আর হামফ্রিস তার পারিবারিক প্রোটেস্ট্যান্ট ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে দ্বীপজুড়ে মিলনচেষ্টা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
















