প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা জনপ্রিয় মডেল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান আমেরিকাস নেক্সট টপ মডেল একসময় বিশ্বজুড়ে বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠানটির নানা বিতর্কিত ও অপমানজনক দৃশ্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এবার একটি নতুন ধারাবাহিক প্রামাণ্যচিত্রে সেই ঘটনাগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল সঞ্চালক টাইরা ব্যাংকসের এক প্রতিযোগীর ওপর চিৎকার করে ক্ষোভ প্রকাশ। সেই দৃশ্য বহু বছর ধরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে। মহামারির সময় আবারও সেই ভিডিও ভাইরাল হলে দর্শকরা অনুষ্ঠানটির পুরোনো পর্বগুলো নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান সময়ের মানদণ্ডে বিচার করলে অনুষ্ঠানের বহু দৃশ্য অস্বস্তিকর ও সংবেদনহীন ছিল। টাইরা ব্যাংকসও পরে স্বীকার করেন, অতীতে কিছু সিদ্ধান্ত ভুল ছিল।
সম্প্রতি একটি পডকাস্টের পর এবার তিন পর্বের নতুন প্রামাণ্যচিত্রে অনুষ্ঠানটির বিভিন্ন বিতর্ক তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সাবেক প্রতিযোগী, নির্মাতা এবং উপস্থাপকরা অংশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—কীভাবে একটি জনপ্রিয় অনুষ্ঠান এতটা বিষাক্ত হয়ে উঠল?
২০০৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল ফ্যাশন জগতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা। অখ্যাত তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বড় মডেল হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল উদ্দেশ্য। সে সময় বাস্তবধর্মী অনুষ্ঠান এখনও শুরুর পর্যায়ে ছিল। প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ ও অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত জীবনের আড়ালের দৃশ্য মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। প্রায় ১৭০টি দেশে এটি সম্প্রচারিত হয় এবং কোটি কোটি দর্শক আকৃষ্ট করে।
অনুষ্ঠানটি বর্ণ ও যৌন পরিচয়ের দিক থেকে বৈচিত্র্য তুলে ধরার জন্য প্রশংসাও পেয়েছিল। তবে সমালোচকদের মতে, ফ্যাশন জগতের বৈষম্য ভাঙার দাবি করলেও অনুষ্ঠানটি অনেক ক্ষেত্রে সেই একই পক্ষপাত বজায় রেখেছিল।
বিচারকদের মন্তব্য সময়ের সঙ্গে আরও ব্যক্তিগত ও অপমানজনক হয়ে ওঠে। প্রতিযোগীদের শরীরের গঠন নিয়ে কটাক্ষ, ওজন বা চেহারা নিয়ে সমালোচনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন আলোকচিত্র চ্যালেঞ্জও বিতর্কের জন্ম দেয়। এক পর্বে প্রতিযোগীদের গায়ে ভিন্ন জাতিগত পরিচয়ের মতো রঙ লাগিয়ে ছবি তোলা হয়, যা পরে ব্যাপক সমালোচিত হয়। আবার গৃহহীনতার বিষয় নিয়ে চিত্রায়ণ, খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত দিয়ে দৃশ্য ধারণ কিংবা হত্যাকাণ্ডের শিকার সাজার মতো চ্যালেঞ্জও ছিল। এক প্রতিযোগী অভিযোগ করেন, তার ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্র্যাজেডি জানা সত্ত্বেও তাকে বন্দুক হামলার শিকার সাজার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আরও কিছু অভিযোগে বলা হয়, একজন প্রতিযোগীকে মাতাল অবস্থায় ধারণ করা ব্যক্তিগত দৃশ্য সম্প্রচার করা হয় এবং আরেকজন যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলার পর যথাযথ সমর্থন পাননি। প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানটি বাস্তবধর্মী ধারাবাহিকে “ভিলেন” তৈরি করার কৌশলও ব্যবহার করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্পাদনার মাধ্যমে কিছু প্রতিযোগীকে ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অনেকেই দাবি করেন।
অনুষ্ঠানটি ২০১৫ সালে প্রথম দফায় শেষ হলেও পরে আবার কয়েকটি পর্ব নিয়ে ফিরে আসে। তবে সমালোচকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রচারিত হওয়ায় এর প্রভাব জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে গভীর হয়েছে। কিছু সাবেক প্রতিযোগী অভিযোগ করেন, অনুষ্ঠান শেষে ফ্যাশন জগতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। কেউ কেউ বলেন, বাস্তবধর্মী অনুষ্ঠানের তারকা হওয়ার কারণে বড় ব্র্যান্ড তাদের সঙ্গে কাজ করতে চায়নি।
নতুন প্রামাণ্যচিত্রে টাইরা ব্যাংকস কিছু ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রযোজকরাও স্বীকার করেছেন, কিছু চ্যালেঞ্জ ভুল ছিল। তবে সবাই এই পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে নন। প্রথম মৌসুমের এক বিজয়ী মনে করেন, অতীতের অনুষ্ঠানকে বর্তমানের মানদণ্ডে বিচার করা সঠিক নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, তবু অতীতের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর প্রভাব পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কারণ এগুলো সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, বর্ণবৈষম্য ও অপমানজনক বিনোদনের সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। অনেকে বলছেন, অনুষ্ঠানটি ছিল তার সময়ের প্রতিচ্ছবি—ফ্যাশন শিল্পের বাস্তবতা ও বিনোদনের নির্মম প্রতিযোগিতার এক রূপক।
















