২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এই ফলাফলের মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ঘোষিত ২৯৭ আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন। এক প্রার্থীর মৃত্যু এবং দুটি আসনের ফল প্রকাশে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে সব আসনের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি।
নিষিদ্ধ থাকা অবস্থার পর এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করেছে। দলটি ৬৮টি আসন পেয়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে আসছে। ৩৫০ সদস্যের সংসদে ৫০টি আসন সংরক্ষিত।
ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি আসন পেয়েছে। দলটির নেতা নাহিদ ইসলাম নিজের আসনে জয়ী হয়ে নতুন সংসদের তরুণ সদস্যদের একজন হচ্ছেন। এই দলটি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর ২০২৪ সালের আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান।
এই নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদ নামে একটি জাতীয় গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়, যার লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার আনা।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কে কত আসন পেল
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ২০৯টি, জামায়াত ৬৮টি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি আসন পেয়েছে। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মিলিয়ে বাকি আসনগুলো জিতেছেন।
বিএনপি সামাজিক মাধ্যমে বিজয়ের দাবি জানিয়ে বলেছে, তারা সরকার গঠনের পথে। দলটি জানিয়েছে, বিজয় উদ্যাপনে মিছিল বা সমাবেশ না করে দেশব্যাপী দোয়ার আয়োজন করা হবে।
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা জোরালো। ১৭ বছর বিদেশে থাকার পর তিনি নির্বাচনের আগে দেশে ফেরেন। অতীতে রাজনৈতিক হয়রানির অভিযোগ তুলে তিনি দেশ ছেড়েছিলেন।
তবে বিভিন্ন সূত্রে আসনসংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্যও দেখা যাচ্ছে, কারণ এখনো চূড়ান্ত সরকারি ফল প্রকাশ হয়নি।
কারচুপির অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বিএনপি উভয়ই কিছু অনিয়ম ও ফল প্রভাবিত করার অভিযোগ তুলেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সীমিত। জামায়াতও বেসরকারি ফল নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা করতে সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছে।
কে জিতেছেন, কে হেরেছেন
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যে জানা গেছে, তারেক রহমান দুটি আসনে জয়ী হয়েছেন। জামায়াতের আমির ঢাকার একটি আসনে জয় পেয়েছেন। বিএনপির মহাসচিবও নিজ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। কয়েকজন আলোচিত বিএনপি নেতা নিজ নিজ এলাকায় জয়লাভ করেছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা একটি আসনে জয়ী হয়েছেন। ঢাকার অধিকাংশ আসনেই বিএনপি এগিয়ে রয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নাহিদ ইসলাম ঢাকার একটি আসনে জয় পেয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন দল হিসেবে তাদের ফল একেবারে খারাপ নয় এবং ভবিষ্যতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
বিএনপির জয় কি প্রত্যাশিত ছিল
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জয় অনেকটাই অনুমেয় ছিল। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্বসহ নানা ইস্যুতে দলটি আগে থেকেই জনসমর্থন বাড়াচ্ছিল। ছাত্র আন্দোলনের পর গড়ে ওঠা গণঅসন্তোষও তাদের পক্ষে গেছে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলের কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে বলেও মত বিশ্লেষকদের।
গণভোটের ফল
জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটে অধিকাংশ ভোটার সমর্থন দিয়েছেন। কমিশনের তথ্যে দেখা গেছে, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার সনদের পক্ষে মত দিয়েছেন। কিছু গণনায় সমর্থনের হার আরও বেশি দেখা যাচ্ছে।
এই সনদে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের মতো প্রস্তাব রয়েছে। বড় দলগুলো মূল বিষয়ে একমত হলেও উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
সামনে কী
বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যা ২০২৪ সালের আন্দোলনের মূল দাবি ছিল।
আওয়ামী লীগ ছাড়া নতুন সংসদে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক উপস্থিতি থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা সংসদের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে।
এদিকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। গত বছর আন্দোলন দমনে প্রাণহানির ঘটনায় তাকে যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে ফেরত চেয়ে অনুরোধ করা হলেও ভারত রাজি না হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।
















