নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি ধারণা দ্রুত ছড়িয়েছে—জামায়াতে ইসলামী নাকি ক্ষমতার খুব কাছে পৌঁছে গেছে। এই ধারণা কেবল রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেই নয়, দীর্ঘদিন ভোটকেন্দ্রবিমুখ অনেক নাগরিকের মনেও প্রভাব ফেলছে। প্রশ্ন হলো, বাস্তবতা কতটা, আর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কতটা?
মাঠের সমীকরণ বলছে, কয়েকটি অঞ্চলে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে—বিশেষ করে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। তাদের একটি নির্দিষ্ট “ভোটব্যাংক” রয়েছে, যা সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। কিছু আসনে তারা জয়ের কাছাকাছি বলেও ধারণা তৈরি হয়েছে। এই উপস্থিতি থেকেই ‘ক্ষমতার দোরগোড়ায়’ কথাটি জোরালো হয়েছে।
তবে ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯১ সালে ১৮টি, ১৯৯৬ সালে ৩টি, ২০০১ সালে ১৭টি এবং ২০০৮ সালে ২টি আসন—এটাই ছিল তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য। গড় ভোটের হার প্রায় ৭–৮ শতাংশের মধ্যে। এই ভিত্তি থেকে হঠাৎ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছানো বাস্তবসম্মত নয়—যদি না বৃহৎ পরিসরে ভোটের আচরণ নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
এবারের বড় ভেরিয়েবল হলো নীরব ভোটার। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নেই, কিন্তু তাদের তৃণমূল সমর্থক ও সংখ্যালঘু ভোটাররা আছেন। অনেক এলাকায় দেখা যাচ্ছে, জামায়াতকে ঠেকাতে এই ভোটের একটি অংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। অর্থাৎ ‘জামায়াতের আতঙ্ক’ নিজেই হয়তো পাল্টা ভোট-সংহতি তৈরি করছে।
এছাড়া সংখ্যালঘু, প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক পরিসরের বড় অংশ জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে সংশয়ে। নারী অধিকার, মুক্তচিন্তা, সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ও ১৯৭১–এর ভূমিকা—এই প্রশ্নগুলো এখনো অনিরসিত। ফলে জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার দেয়াল পুরোপুরি ভাঙা তাদের জন্য কঠিন।
অন্যদিকে, গণভোটের ফল যদি সাংবিধানিক কাঠামোয় উচ্চকক্ষ বা নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে, সেখানে জামায়াতের ভোটশক্তি তুলনামূলক বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থাৎ সরাসরি একক সরকার নয়, বরং ক্ষমতার কাঠামোয় প্রভাবশালী অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বাস্তবসম্মত।
সব মিলিয়ে বলা যায়, “ক্ষমতার দোরগোড়ায়” কথাটি রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণাগত প্রভাব ফেলছে। তবে নির্বাচনে ভোটের চূড়ান্ত আচরণ—বিশেষ করে নীরব ও কৌশলগত ভোট—ফলাফলের আসল নির্ধারক হবে।
















