রাজনৈতিক অস্থিরতার এক দীর্ঘ পর্ব পেরিয়ে ভোটের মুখে বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দেশটি কার্যত একটি ভেঙে পড়া স্বৈরশাসনের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা গড়ার চেষ্টা করছে।
প্রায় দুই দশক পর আওয়ামী লীগ ব্যালট থেকে অনুপস্থিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলটি একদিকে প্রবৃদ্ধির সাফল্য প্রচার করলেও, অন্যদিকে বিরোধী কণ্ঠ দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিল। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ নির্বাসনে, কেউ কারাগারে, কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষিত—ফলে রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
এই শূন্যতা পূরণের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে বিএনপি। দীর্ঘদিন দমন–পীড়নের মুখে কোণঠাসা থাকা দলটি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে নতুন উদ্দীপনা পেয়েছে। দলটি এখন বড় আদর্শিক বিতর্কের বদলে মূল্যস্ফীতি, জীবিকার সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার মতো তাৎক্ষণিক ইস্যুতে জোর দিচ্ছে। পরিবার কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে তারা। তবে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামাল দেওয়া এখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
কিন্তু বিএনপির পথ মসৃণ নয়। জামায়াতে ইসলামী নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিতর্কিত ভূমিকাকে পেছনে ফেলে দলটি নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত ও শৃঙ্খলাপূর্ণ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে ক্লান্ত ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের এই বার্তায় সাড়া দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ডানমুখী ঝোঁক ভবিষ্যতে বহুত্ববাদ ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তরুণ ভোটাররা। মোট ভোটারের প্রায় এক–তৃতীয়াংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে তারাই সামনের সারিতে ছিল। প্রচলিত দলগুলোর রাজনীতিতে তাদের আস্থা সীমিত। জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো নতুন উদ্যোগগুলো এখনো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচার ও তৃণমূল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট রাজনীতির সমীকরণকেও বদলে দিয়েছে।
তবে সহিংসতার শঙ্কা এখনো কাটেনি। নির্বাচনী প্রচারণায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে নাজুক করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে একটি বড় অংশের ভোটার প্রতিনিধিত্বহীন বোধ করতে পারেন—এতে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্থিরতার বীজ রোপিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোও পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। তবে ভোটকেন্দ্রে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের কাছে মূল প্রশ্নটি ভিন্ন—দেশ কি শক্তিমান ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে সরে এসে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কঠিন পথে হাঁটতে প্রস্তুত?
এই নির্বাচন তাই কেবল সরকার পরিবর্তনের ভোট নয়; এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। ভুল পথ বেছে নিলে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থান ইতিহাসে সংক্ষিপ্ত বিরতি হিসেবেই থেকে যেতে পারে। আর সঠিক সিদ্ধান্ত হলে সেটিই হতে পারে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের ভিত্তি।
















