শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এই প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের ছাত্র–আন্দোলনের পর ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে প্রায় দেড় দশক পর এক ভিন্ন বাস্তবতায় ভোট হচ্ছে, যা অনেক বিশ্লেষকের মতে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। পরে তা দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রাণ হারান। ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। তিন দিন পর শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার নতুন নির্বাচন আয়োজন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। জুলাই জাতীয় সনদ নামে প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজও গণভোটে তোলা হচ্ছে, যা জাতীয় নির্বাচনের দিনই অনুষ্ঠিত হবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য দুই হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৭ শতাংশের বয়স ২৫ থেকে ৪৪ বছরের মধ্যে।
কারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী
বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনটি শক্তি সবচেয়ে আলোচিত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি এখন সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে। প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে অবস্থানের পর তিনি গত ডিসেম্বর দেশে ফেরেন। তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্বে আসেন। বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রী–রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে। দলটি বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের কথা বলছে, যাতে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করা যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টি নিজেকে তরুণদের দল হিসেবে তুলে ধরছে এবং নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে কর্মসূচিনির্ভর রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে দেশ। এখন ভোটাররা কেবল বক্তৃতা নয়, বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা দেখতে চান।
কোন বিষয়গুলো আলোচনায়
নির্বাচনী প্রচারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দুর্নীতি ও বেকারত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের তদন্তে আগের শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ সামনে এসেছে। পোশাক ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে বেকারত্ব বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজের অভাবে হতাশ। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি কমে যাওয়া ও বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। বিএনপি দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন জোট, পুরোনো দ্বন্দ্ব
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে বিএনপি ও অন্য দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও কয়েকটি দল প্রশাসনিক সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেও বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে অনড় ছিল।
ফলে এখন রাজনৈতিক ময়দান মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বে গঠিত জোট।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের যে ভোটভিত্তি এখন শূন্য হয়ে আছে, সেটি ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সামনে কী সম্ভাবনা
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও এককভাবে সরকার গঠন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারেক রহমান ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তবে জামায়াত ঐক্য সরকারের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে।
এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৩০ শতাংশ ভোটার প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে ভোট দেবেন। প্রায় সমানসংখ্যক ভোটার দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন। আরও এক-তৃতীয়াংশ ভোটার প্রার্থী ও দল—উভয় বিষয় বিবেচনায় নেবেন।
একই দিনে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটেও বড় প্রভাব পড়তে পারে। প্রস্তাব অনুমোদিত হলে নতুন সংসদ ছয় মাসের জন্য গণপরিষদের মর্যাদা পাবে এবং বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে পারবে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার পর বাংলাদেশের এই প্রথম নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















