ইসরায়েলের গাজায় সামরিক অভিযানের শুরুতেই ব্যাপক প্রাণহানি হলেও, পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই সন্দেহ ছড়ানোর প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনিদের মানবিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করেছে এবং তাদের দুর্ভোগকে অবমূল্যায়ন করেছে। সম্প্রতি ইসরায়েল নিজেই প্রায় ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করায় সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি অভিযানের প্রথম ১৮ দিনের মধ্যেই সাত হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ছিল শিশু। এই সময় বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রে তখনকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নিহতের সংখ্যার ওপর আস্থা প্রকাশ করেননি। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, ফিলিস্তিনিদের দেওয়া সংখ্যার ওপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস নেই, যদিও নিরীহ মানুষ নিহত হওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেন।
পরবর্তী দুই বছরে নিহতের সংখ্যা বহু গুণ বেড়ে যাওয়ার পর ইসরায়েলি সামরিক সূত্র স্বীকার করে যে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দীর্ঘদিনের হিসাবের সত্যতা কার্যত নিশ্চিত হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, পশ্চিমা সরকার ও প্রভাবশালী গণমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি সহিংসতার ব্যাপ্তি আড়াল করা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
আমেরিকান-আরব অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন কমিটির নির্বাহী পরিচালক আবেদ আইয়ুব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। তাঁর মতে, বাইডেন প্রশাসন এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যাতে ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও একইভাবে মৃত্যুর সংখ্যা অস্বীকার করতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি, কারণ মানুষ নিজের চোখেই ধ্বংস ও হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭১ হাজার ৭৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধবিরতির পরও কয়েক শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাও বারবার বলেছে, এই হিসাব যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য।
তবে গবেষকরা মনে করেন, প্রকৃত মৃত্যু সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। নিখোঁজ মানুষ, চিকিৎসাব্যবস্থা ধ্বংসের কারণে পরোক্ষ মৃত্যু এবং অবরোধজনিত প্রাণহানি এতে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। একটি চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, গাজায় মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ৪০ শতাংশ কম রিপোর্ট হয়েছে।
এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা ফিলিস্তিনি তথ্যকে অবিশ্বাস্য হিসেবে তুলে ধরতে থাকেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ একটি বিল পাস করে, যাতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মৃত্যু পরিসংখ্যান ব্যবহার করতে না পারে।
অনেক পশ্চিমা গণমাধ্যম দীর্ঘ সময় ধরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ‘হামাস-নিয়ন্ত্রিত’ বলে উল্লেখ করেছে। সমালোচকদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের বক্তব্যকে খাটো করা এবং নিহতদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়টি পেশাদার চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত এবং তাদের পরিসংখ্যান নিয়ে কারচুপির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফিলিস্তিনি কমিউনিটি নেটওয়ার্কের নেতা হাতেম আবুদাইয়্যাহ বলেন, ফিলিস্তিনিরা যখন নিজেদের ওপর চালানো সহিংসতার কথা বলে, তখন বিশ্বকে তা বিশ্বাস করতে হবে। তাঁর মতে, পশ্চিমা গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের বক্তব্য যাচাই করা এবং বাস্তব সত্য তুলে ধরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গাজার ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, কেন স্বাধীন ও বিকল্প গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে।
















