পশ্চিম আফ্রিকার তিন দেশ মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারে সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। এবার এই দেশগুলোর সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যা ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আফ্রিকাবিষয়ক ব্যুরোর প্রধান নিক চেকার মালির রাজধানী বামাকো সফর করবেন। এই সফরের উদ্দেশ্য হিসেবে মালির সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান জানানো এবং অতীতের নীতিগত ভুল পেরিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন পথ খোঁজার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মালির মিত্র দেশ বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সঙ্গেও নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ঘোষণায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে একের পর এক অভ্যুত্থানে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করেছিল। নাইজারের সাবেক প্রেসিডেন্ট এখনও গৃহবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
এই অবস্থান পরিবর্তন স্পষ্ট হতে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে। নতুন মেয়াদ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সহায়তা সংস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর নীতির কেন্দ্রে উঠে আসে নিরাপত্তা ও খনিজ সম্পদ, যেখানে উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন গুরুত্ব হারায়।
মালির সামরিক নেতৃত্বসহ এই তিন দেশের শাসকগোষ্ঠী ফ্রান্সবিরোধী ও প্যান-আফ্রিকান অবস্থান নিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা গড়ে তুলেছে। বুরকিনা ফাসোর নেতা ইব্রাহিম ত্রাওরে নিজেকে সাম্রাজ্যবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন স্পষ্ট করেছে, ইউরোপীয় ধাঁচের নির্বাচিত সরকারব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া তাদের লক্ষ্য নয়। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বলেছেন, জনগণ তাদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিজেরাই বেছে নেবে, এতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আগের প্রশাসনের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন। আগে সুশাসন ও পরিবেশগত বিষয়কে নিরাপত্তা সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হতো। এখন মূল অগ্রাধিকার জঙ্গিবাদ দমন।
সাহেল অঞ্চলে সক্রিয় ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিছু হিসাবে, বিশ্বে সন্ত্রাসবাদজনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক এখন এই অঞ্চলে ঘটে। মালির উত্তরাঞ্চল, বুরকিনা ফাসো ও নাইজারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ইসলামিক স্টেট–ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো বিশেষভাবে সক্রিয়।
এই অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের রপ্তানিতেও ঝুঁকি তৈরি করছে। মালি স্বর্ণ ও লিথিয়াম উৎপাদন করে, আর নাইজারের রয়েছে বড় ইউরেনিয়াম মজুত। নাইজারের সামরিক সরকার ফরাসি কোম্পানির কাছ থেকে প্রধান ইউরেনিয়াম খনি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে না, এই তিন দেশে রাশিয়া একমাত্র নিরাপত্তা অংশীদার হয়ে উঠুক। যদিও ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতিকে তারা এখন আর বড় হুমকি হিসেবে দেখছে না। বর্তমানে মালিতে প্রায় এক হাজার রুশ নিরাপত্তা সদস্য রয়েছে এবং বুরকিনা ফাসো ও নাইজারেও সীমিত উপস্থিতি আছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা এই দেশগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য সহায়তা দিচ্ছে এবং প্রয়োজনে অস্ত্র সরবরাহের কথাও বিবেচনায় রয়েছে। তবে স্থায়ী সেনা মোতায়েন বা নাইজারের আগাদেজে থাকা ড্রোন ঘাঁটি পুনরায় চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই।
অভ্যুত্থানের পর আঞ্চলিক জোট থেকে বেরিয়ে এসে মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার নিজেদের জোট গড়েছে। এতে তাদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নিয়ে আঞ্চলিক চাপও কমেছে। একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও জঙ্গি তৎপরতা বাড়ায় যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা ও সীমিত সামরিক সহযোগিতা স্বল্পমেয়াদে কিছু সাফল্য আনতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই দরিদ্র ও জটিল অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা না করলে পরিস্থিতির টেকসই সমাধান হবে না।
















