দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি ও মুনাফার চাপ সামলাতে হিমশিম খাওয়া স্টারবাকস এবার প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে গ্রাহক ফেরানোর চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আউটলেটে এখন কফি অর্ডার নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবট, আর দোকানের ভেতরে কর্মীরা সহায়তা পাচ্ছেন ভার্চুয়াল সহকারীর মাধ্যমে।
ড্রাইভ-থ্রুতে অনেক সময় হাসিমুখে যে কর্মী অর্ডার নেন বলে মনে হয়, বাস্তবে সেখানে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত একটি সিস্টেম। কাউন্টারের পেছনে কর্মীরা রেসিপি মনে রাখা বা শিডিউল সামলাতে ভার্চুয়াল সহায়কের সাহায্য নিচ্ছেন। দোকানের পেছনে পণ্য গণনার কাজ করছে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং প্রযুক্তি, যা কর্মীদের সময় বাঁচাচ্ছে এবং পণ্য ঘাটতির সমস্যা কমাতে সহায়তা করছে।
এই প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ স্টারবাকসের সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নেওয়া শত শত মিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনার অংশ। লক্ষ্য একটাই, হারিয়ে যাওয়া গ্রাহকদের ফিরিয়ে আনা। এরই মধ্যে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলেছে। সম্প্রতি কোম্পানিটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পুরোনো দোকানগুলোতে দুই বছরের মধ্যে প্রথমবার বিক্রি বেড়েছে। এই বাজার থেকেই স্টারবাকসের প্রায় ৭০ শতাংশ আয় আসে।
তবে বিপুল বিনিয়োগের কারণে মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও বেড়েছে। ফলে কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে। প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান নিকল বলেন, ধারাবাহিক বিক্রি বাড়লে শেষ পর্যন্ত এই সমস্যার সমাধান হবে। আগামী তিন বছরে ব্যয় কমিয়ে দুই বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, আর সে কারণে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় স্টারবাকস নানা চাপে ছিল। একের পর এক মূল্যবৃদ্ধিতে গ্রাহকদের অসন্তোষ, প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া, কর্মীদের ইউনিয়ন আন্দোলন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ঘিরে বয়কট ডাক—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছিল কোম্পানি। নতুন প্রধান নির্বাহী দাম বাড়ানো বন্ধ করেন, মেনু সহজ করেন এবং চার মিনিটের মধ্যে অর্ডার সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন।
একই সঙ্গে হাজার হাজার করপোরেট পদ ছাঁটাই, লোকসানী দোকান বন্ধ এবং চীনে বড় অংশীদারিত্ব বিক্রি করে দেয় স্টারবাকস। তবে নিকলের মতে, প্রতিষ্ঠানটি একসময় দক্ষতা আর প্রযুক্তির হিসাবেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিল, গ্রাহক অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের দিকটি আড়ালে চলে গিয়েছিল।
এই অভিজ্ঞতা ফেরাতেই আবার হাতে লেখা নামসহ কাপ দেওয়া শুরু হয়েছে। দোকানগুলোতে আরামদায়ক চেয়ার, নতুন রঙ আর সিরামিক মগ যোগ করা হচ্ছে। প্রতিটি দোকানে এই পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মীদের পোশাক ও শৌচাগার ব্যবহারে কড়াকড়ির মতো কিছু কঠোর নীতিও চালু হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে দ্বন্দ্বের প্রশ্ন উঠলেও নিকল মনে করেন, প্রযুক্তি গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ করে। কফির সঙ্গে গ্রাহকের মনের অবস্থার মিল খুঁজে দেওয়ার চ্যাটবট, আগাম অর্ডার শিডিউল করার সুবিধা এবং ড্রাইভ-থ্রুতে স্বয়ংক্রিয় অর্ডার ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মীরা অতিথি সেবায় বেশি সময় দিতে পারছেন।
সাম্প্রতিক বিনিয়োগকারীদের বৈঠকে নিকল জানান, কোম্পানির গতি ফিরছে এবং বিদেশে ব্যাপক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রায় চল্লিশ হাজার দোকানে পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। যদিও আবার মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি, তবে সেটিকে শেষ বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি কমে আসা, কফির দামের চাপ কিছুটা হ্রাস এবং শুল্ক থেকে কফিকে বাদ দেওয়ায় কোম্পানির ব্যয় কমার আশা করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে বিরোধিতাও অনেকটাই কমেছে, যদিও কর্মী ইউনিয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব এখনও চলমান।
সবকিছুর পরও স্টারবাকস কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, তাদের আসল শক্তি কফি নয়, বরং ক্যাফেগুলোই। মানুষের জন্য নিরাপদ, স্বাগতপূর্ণ মিলনস্থল তৈরি করতে পারলেই স্টারবাকস আবারও আগের মতো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে তারা আশা করছেন।















