আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে, কিন্তু ভাঙা রাজনৈতিক ঐক্য, দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং তীব্র মেরুকরণের মধ্যে ভোটের প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দিন ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১৬ জন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার ও আইন সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ৪০১টি ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৪৪ জন আহত হন।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে। পুলিশের হিসাবে, সে সময় পাঁচ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়, যার মধ্যে এখনো এক হাজার ৩৩৩টি উদ্ধার হয়নি। নির্বাচনের আগে এটি বড় উদ্বেগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নির্বাচন হচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। ভোটাররা সংসদ সদস্য নির্বাচনের পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ ও ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদ ঠেকাতে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর ওপরও মত দেবেন। নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জামায়াতে ইসলামী এবং শিক্ষার্থী নেতৃত্বে গঠিত নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি।
যেসব রাজনৈতিক শক্তি একসময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিল, তারা এখন সংস্কার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে। ফলে নির্বাচন হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, বৈধতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উচ্চঝুঁকির লড়াই।
এবার ভোটার সংখ্যা এক কোটি ২৭ লাখের বেশি, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রায় দুই হাজার প্রার্থীর মধ্য থেকে ৩০০ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে অন্তত ১৫১টি আসন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচার জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতাও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং ক্ষমতার লড়াই এই সহিংসতার প্রধান কারণ। সম্প্রতি রাজধানীতে উদীয়মান যুবনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পুলিশ বলছে, এই হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসূত্র থাকতে পারে।
এ ছাড়া বিএনপির ভেতরের কোন্দলও সহিংসতার একটি বড় উৎস হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে অনেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় একই দলের মধ্যেই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি এখন ‘করো বা মরো’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি সংস্কারপন্থী অবস্থানে কাছাকাছি থাকলেও বিএনপি সব সংস্কার মেনে নিতে অনিচ্ছুক বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন এখন সংস্কারপন্থী বনাম বর্তমান কাঠামো বজায় রাখার পক্ষের দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে এই বিভাজন তীব্র ভাষা ও পাল্টা অভিযোগে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিএনপি জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার করার অভিযোগ তুলছে, আর জামায়াত বিএনপিকে দুর্নীতিগ্রস্ত ও সন্ত্রাসী শক্তি হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত তদন্তও সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে। প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতার কারণে অনেক কর্মকর্তা সংকটের সময় নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সংস্কার প্রশ্ন। নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রস্তাব নিয়ে গণভোট রাজনৈতিক পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তরুণ ও সংস্কারপন্থী ভোটারদের লক্ষ্য করে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রচার চালাচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপির সমর্থন বেশি বয়স্ক ও প্রভাবশালী শ্রেণির মধ্যে শক্ত।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক গণমাধ্যম প্রকাশ্যে পক্ষ নিচ্ছে এবং ভোটের আগেই নির্দিষ্ট নেতাকে ভবিষ্যৎ সরকারপ্রধান হিসেবে তুলে ধরছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করছে।
আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাবও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করা হচ্ছে। নির্বাচনের পর বিদেশি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে, যদিও প্রতিবেশী দেশগুলো শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নির্বাচনী লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। ফল যাই হোক, পরবর্তী সরকারকে অর্থনৈতিক সংস্কার, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সব ঝুঁকি সত্ত্বেও নির্বাচনের বিকল্প নেই। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য এই নির্বাচন অপরিহার্য বলেই তারা মনে করছেন।
















