মিনিয়াপোলিস – যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিস শহরে অভিবাসন অভিযানের সময় আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেটি গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত দুই ফেডারেল এজেন্টকে প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ ও সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার থেকেই ওই দুই কর্মকর্তাকে ছুটিতে রাখা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া পদক্ষেপ। ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশধারী অভিবাসন কর্মকর্তারা প্রেটিকে মাটিতে ফেলে আটকে রাখার পর তাকে একাধিকবার গুলি করা হয়, যা দ্রুত প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের এক মুখপাত্রের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে যুক্ত দুই কর্মকর্তা বর্তমানে প্রশাসনিক ছুটিতে রয়েছেন। তবে ঘটনার সময় যারা প্রেটিকে ধরে রাখতে সহায়তা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অতিরিক্ত কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।
মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কংগ্রেস সদস্যদের কাছে পাঠানো প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রথমে এক বর্ডার প্যাট্রোল এজেন্ট মাটিতে পড়ে থাকা প্রেটির ওপর গুলি চালান। এরপর কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনের আরেক কর্মকর্তা গুলি করেন।
এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অঙ্গনজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। যদিও শুরুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ঘটনাটিকে বৈধ বলে দেখাতে এবং নিহত ব্যক্তিকেই দায়ী করতে চেয়েছিলেন।
প্রেটির হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে, ৭ জানুয়ারি, মিনিয়াপোলিসের বাসিন্দা তিন সন্তানের মা রেনি গুডও এক অভিবাসন কর্মকর্তার গুলিতে নিহত হন। এই দুই ঘটনার পর ফেডারেল কর্মকর্তাদের সহিংসতা নিয়ে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
এই চাপ সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিনিয়াপোলিসে মোতায়েন অভিবাসন বাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন। বিতর্কিত কৌশলের জন্য সমালোচিত বর্ডার প্যাট্রোল কর্মকর্তা গ্রেগ বোভিনোকে সরিয়ে তার স্থানে নীতিনির্ভর অভিবাসন প্রধান টম হোম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে মিনিয়াপোলিসে চলমান অভিবাসন অভিযানের বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্যে দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। একদিকে তিনি পরিস্থিতি শান্ত করার কথা বলছেন, অন্যদিকে শহরের মেয়র জেকব ফ্রেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন তিনি আগুন নিয়ে খেলছেন। মেয়র ফ্রে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, শহরের পুলিশ ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগে সহায়তা করবে না।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, মেয়রের বক্তব্য আইন লঙ্ঘনের শামিল। এর জবাবে ফ্রে বলেন, পুলিশের কাজ মানুষকে নিরাপদ রাখা, ফেডারেল অভিবাসন আইন প্রয়োগ নয়।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মিনিয়াপোলিসের রাস্তায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিবাসন অভিযান কমেনি, তবে তা এখন আরও নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি মিনিয়াপোলিস সফরে এসে ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার কঠোর বহিষ্কার নীতির অংশ হিসেবে মিনিয়াপোলিস ও মিনেসোটা রাজ্যে হাজারো ফেডারেল কর্মকর্তা পাঠিয়েছেন। এতে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর বলেন, ফেডারেল বাহিনীর উপস্থিতির কারণে মানুষ বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রেসিডেন্টের বক্তব্য উগ্র ডানপন্থীদের উসকে দিচ্ছে। তার ভাষায়, সাংবিধানিক অধিকার ভেঙে ফেলা হচ্ছে এবং ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অ্যালেক্স প্রেটির বাবা-মা একজন সাবেক ফেডারেল কৌঁসুলিকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি আগে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষী পুলিশ কর্মকর্তার সাজা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। অন্যদিকে, রেনি গুডের পরিবারও একটি খ্যাতনামা আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়েছে।
এই দুই হত্যাকাণ্ড মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন অভিযান, ফেডারেল শক্তি প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
















