গাজা পুনর্গঠন তদারকির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি বোর্ড’-এ যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ ইউরোপের অধিকাংশ দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে বা বিষয়টি বিবেচনাধীন বলে জানিয়েছে। বিভিন্ন দেশের উদ্বেগ ও আপত্তির কারণে এই উদ্যোগে ইউরোপীয় ঐক্যের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতর থেকে এখন পর্যন্ত কেবল হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়া এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিভক্ত অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করলে এবারও একই ধরনের অনৈক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
স্পেন, যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়া ইতিবাচক সাড়া দিলেও ফ্রান্স আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফ্রান্সের মতে, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড গাজা ইস্যুর সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং জাতিসংঘের নীতি ও কাঠামো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ডেনমার্ককে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর আগে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।
গত ২২ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি বোর্ডের সনদে স্বাক্ষর করেন। তিনি একে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে অনেক দেশের কাছে এটি জাতিসংঘের ভূমিকা খর্ব করার প্রচেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
ট্রাম্প যদিও বলেছেন জাতিসংঘের অস্তিত্ব থাকা উচিত, তবে সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ সনদের প্রতি তার শ্রদ্ধা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের মধ্যেই রাশিয়াকে এই বোর্ডে আমন্ত্রণ জানানো সমালোচনা আরও বাড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথা মাথায় রেখেই এই উদ্যোগ নিচ্ছেন। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় বড় ধরনের পররাষ্ট্রনীতিগত সাফল্য দেখানোর প্রয়োজন রয়েছে তার।
বোর্ডের সদস্যদের আজীবন সদস্যপদের জন্য এক বিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার আহ্বান জানানো হলেও এই অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও বোর্ডের নির্বাহী পরিষদের সদস্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের পেছনে আরও বড় ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। ইউরোপের মধ্যম শক্তিগুলোকে একত্র করে তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়াই ট্রাম্পের উদ্দেশ্য হতে পারে।
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়কার তথাকথিত ইচ্ছুক জোটের মতোই এবারও নানা বৈশিষ্ট্যের দেশকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এতে বহুপাক্ষিকতার বিকল্প পথ রুদ্ধ করাই লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে মধ্যম শক্তিগুলোর বিকল্প জোট গঠনের আহ্বান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এর পরপরই কানাডার আমন্ত্রণ বাতিল করা হয়।
চীন এই শান্তি বোর্ডে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে থাকবে।
জাতিসংঘও ট্রাম্পের এই উদ্যোগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, শান্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধ ক্ষমতা কেবল নিরাপত্তা পরিষদেরই রয়েছে।
ট্রাম্প নিজেকে এই বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন এবং সব সদস্যের সিদ্ধান্ত বাতিল করার ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেছেন। বোর্ডের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাও বাধ্যতামূলক নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শান্তি বোর্ড উদ্যোগ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে এবং ইউরোপের মধ্যম শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
















